পর্দা না পোশাক! কুর’আনের কথা

নারী পুরুষের পোশাক

কুর’আনে উল্লেখিত পোশাকের মৌলিক নিয়ম এই প্রবন্ধের শেষ দিকে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবন্ধে বিভিন্ন সমাজ ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে পর্দার (হিজাব) নিয়ম-কানুন সচিত্র তুলে ধরা হলো। যাতে এ বিষয়ে সমাজে প্রচলিত আচরণের প্রেক্ষাপট বা কারণ বোঝা যায়।

এই প্রবন্ধে যা রয়েছে:

১. বাংলাদেশি পর্দার হালচাল
২. তাওরাত (তোরাহ) অনুযায়ী ইহুদিদের পর্দা প্রথা
৩. বাইবেল অনুযায়ী খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের পর্দা প্রথা 
৪. প্রাচীন বাঙ্গালি সমাজে পর্দা প্রথা 
৫. হিন্দু ধর্মগ্রন্থে পর্দার বিধান
৬. আফগানিস্তানে প্রচলিত পর্দা প্রথা
৭. হাদীসের আলোকে পর্দা বা হিজাব 
৮. মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে পোশাক
৯. এসব আয়াতে যা বলা হলো

পর্দা মূলত ফার্সি শব্দ। যার আরবি প্রতিশব্দ হিজাব। এর বাংলা অর্থ- আবৃত করা, ঢেকে রাখা, আবরণ, আড়াল, অন্তরায়, আচ্ছাদন, পোশাক দ্বারা সৌন্দর্য ঢেকে রাখা, আবৃত করা বা গোপন করা ইত্যাদি।

১. বাংলাদেশি পর্দার হালচাল:

সংক্ষেপে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো। বাংলাদেশে নারীদের ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের নিয়ম চলছে।

১. কঠোর পর্দা,
২. ঢিলে-ঢালা পর্দা
৩. দ্বিধান্বিত পর্দা

ঘরের বাইরে বের হলে দু’টি চোখ ছাড়া যারা আপাদমস্তক ঢেকে রাখেন, নিজ গৃহের অন্দরমহলে থাকেন, গৃহে পুরুষ মানুষ এলে সামনাসামনি সাক্ষাত করেন না—তাঁরাই মূলত ‘কঠোর পর্দা’ পালন করে থাকেন। তাঁরা সচেতনভাবেই এ নিয়ম মান্য করেন। খোদায়ী বিধান মানার অনুভূতি ও পুণ্য লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁদের অন্তরে সর্বদা জাগ্রত থাকে।

অন্যদিকে, যাঁরা ঘরের বাইরে রং-বেরঙের বোরকা, চাদর/কাপর ব্যবহার করেন, মুখমণ্ডল ও হাত ঢাকার কথা ভাবেন না, বাসায় পুরুষ মেহমান এলে পর্দা মেনে সামনে এসে কথা বলেন, এই নিয়মে অফিস-আদালতে কাজ করেন—তাঁদেরকেই মূলত ‘ঢিলে-ঢালা পর্দা’ পালনকারীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এই দলের বেশিরভাগই পরিবার ও সমাজ থেকে পর্দার নিয়ম-কানুন শিখেছেন। তাঁরাও সামাজিক-ধর্মীয় নিয়ম মানা এবং পুণ্য লাভের চিন্তা হৃদয়ে লালন করেন। আধুনিক বাঙালি সমাজে এমন নারীর সংখ্যা অনেক।

পাশাপাশি, আরেক দল নারী আছেন যারা পর্দা করা বা না-করাকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ফ্যাশনের অংশ বলে মনে করেন। কখনও পর্দা করেন, কখনও করেন না—এমন চর্চায় অভ্যস্ত। পাপ-পুণ্যের দোলাচলে দুললেও তাঁরা মনের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সোপর্দ করেছেন।

নারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি তরুণ-যুবকরা ‘পুরুষের পর্দা’ সম্পর্কে খুব একটা সচেতন না। তাঁরা এটুকু জানেন যে- নারীদের দিকে তাকানো ঠিক নয়, গুনাহ হয় এবং নিজের ‘নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত’ ঢেকে রাখাটাই ছেলেদের পর্দা।

তবে, পর্দা মানা না-মানার বাধ্যবাধকতা মূলত নারীদের ওপরই বর্তায় বলে বাঙ্গালি পুরুষ মনে করেন।

২. তাওরাত বা তোরাহ অনুযায়ী ইহুদিদের পর্দা প্রথা

বর্তমান ইসরায়েলের তেল আভিভ, জেরুসালেম, আমেরিকার বিশাল ইহুদি কমিউনিটি অথবা ইরানের ইহুদি কমিউনিটির দিকে তাকালে তাওরাতের একনিষ্ঠ অনুসারী বা আহলে কিতাবদের দেখতে পাওয়া যায়। তোরাহ’র বিধান এবং ইহুদি রাব্বি বা রাবাইদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সারাংশ করলে দাঁড়ায়:

আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ইহুদি নারীদের কয়েক স্তরের কাপড় দিয়ে নিজেদের আবৃত করে রাখা বাধ্যতামূলক। শরীরের কোনও অংশ অনাবৃত করার অধিকার তাদের নেই। 

যারা কিছুটা শরীর ঢাকেন না, তাদেরকেও বিবাহিত হলে মাথায় স্কার্ফ বা হিজাব পরতেই হবে- যাতে চুল খোলা রাখা মেয়েদের অবিবাহিত বা ‘অ্যাভেইলেভল’ বলে চেনা ও জানা যায়।

ইসরায়েলের জেরুসালেম, তেল-আভিভ ও মার্কিন ইহুদি নারীদের পর্দা পালনের কিছু ছবি দেওয়া হলো- যাতে তাদের পর্দার বিধি-বিধান বোঝা যায়।

ইসরাইলের ইহুদি নারী
ইসরাইলে পর্দা মেনে চলা ইহুদি নারীগণ
ইহুদি নারী ও পুরুষ
ইহুদি নারী ও পুরুষ
Gan Ha-Shlosha, Sakhneh, beautiful places in Israel. Located in the Lower Galilee 2001, Photo © Alex Levac
স্থানীয় পোশাকে ইসরাইলি শিল্পী

৩. বাইবেল অনুযায়ী খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের পর্দা প্রথা

ক্রিশ্চিয়ান নান-গণই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। নিচে তেমনই কিছু ছবি দেওয়া হলো। কপটিক খ্রিষ্টান বা অর্থডক্স খ্রিষ্টান—যাই হোক না কেন, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে নারীরা যে পোশাক পরেন, তাই মূলত বর্তমান ইঞ্জিল বা বাইবেল নির্ধারিত পোশাক।

Concept of Veil in the Holy Bible:

The covering of the head is not a concept that is unique to Islam, but is found in Bible as well. The Bible taught the wearing of a veil long before Islam.

In the Old Testament we read:

“When Re-bek’ah lifted up her eyes, and when she saw Isaac, she lighted off the camel. For she had said unto the servant, ‘What man is this that walketh in the field to meet us?’ And the servant had said ‘It is my master’. Therefore she took a veil and covered herself.” [Genesis: 24:64-65]

In the New Testament we read:

“But every woman that prayeth or prophesieth with her head uncovered dishonoureth her head: for that is even all one as if she were shaven. For if the woman be not covered, let her also be shorn: but if it be a shame for a woman to be shorn or shaven, let her be covered.”(1 Corinthians: 11: 5-6)

Whenever a Christian imagines Mother Mary (pbuh) or wherever we see a sculpture of her, we find that she [Mother Mary (pbuh)] is always a lady in hijab (covering her hair with a cloth), however, there are certain Christian women who desire to dress up with the least possible cloth material today. Even if they wear a good measure they’ll make sure that it must be all very revealing.

খ্রিষ্টান নারীদের ধর্মীয় পোশাক

উল্লেখ্য যে, খ্রিষ্ট ধর্মের বিধান ও বিখ্যাত পাদ্রিদের বক্তব্য অনুযায়ী নারীদের সামাজিক অবস্থান এতটাই অপবিত্র যে, যে নারী তার জন্মগ্রহণের জন্য দুঃখিত ও অনুতপ্ত হতে বাধ্য। তাই, সেসব বিষয় এখানে উল্লেখ করা হলো না। শুধুমাত্র খ্রিষ্ট ধর্মের বিধান অনুযায়ী পর্দা প্রথার বৈশিষ্ট্য এখানে সচিত্র তুলে ধরা হলো।

মোদ্দাকথা, খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী নারীদের মাথা ঢাকা ও লম্বা পোশাক দিয়ে শরীর ঢেকে রাখার বিধানই রয়েছে। তবে তা তোরাহ’র অনুসারীদের মতো ততটা কঠিন নয়।

যদিও বর্তমান খ্রিষ্টান নারী ও পরুষগণ (আহলে কিতাবগণ) এসব পোশাকি ধর্মীয় বিধান মানেন না। তারা মনে করেন, এমন পোশাক পরা বা না-পরায় কোনও পাপ-পুণ্য নেই। কারণ, যিশু খ্রিষ্ট (ঈসা আ.) নিজ জীবন উৎসর্গ করে তাদের সবার পাপ অগ্রীম সাফ (মাফ) করে গেছেন। এজন্য সম্পূর্ণ নগ্ন থাকাও কোনও পাপ কাজ নয়!

৪. প্রাচীন বাঙ্গালি সমাজে পর্দা প্রথা

এবার অবিভক্ত ভারতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে পর্দা প্রথার প্রচলন কেমন ছিল তা বোঝার চেষ্টা করব।

বাংলাদেশের গবেষক জনাব গোলাম মুরশিদের ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের ২৩৩ থেকে ২৩৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত দেখুন।

(বই এর পৃষ্ঠার ছবি)

–হাজার বছরের বাঙ্গালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ

উপরোক্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, ভারতীয় বাংলা অঞ্চলে হিন্দু মুসলিম উভয় সমাজে পর্দা প্রথার কঠোর প্রচলন ছিল। মুসলিম নারীগণ বোরকা পরতেন; তবে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের মতো করে সমাজ-সভ্যতা থেকে গৃহাভ্যন্তরে নিজেদের আড়াল করে রাখতেন।
এই কষ্টকর ও প্রাণান্তকর চেষ্টার এক পর্যায়ে হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সমাজের শিক্ষিত অংশ পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। শহুরে শিক্ষিত নারী ও পুরুষ এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
৫. হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদেও সংশ্লিষ্ট কিছু বিধি-বিধান রয়েছে

It is mentioned in the RigVeda Book no. 8 Hymn no. 33 V. no. 19

“When Brahma has made you a woman, you should lower your gaze and should not look up. You should put your feet together and you should not reveal what the garment and the veil conceals.”

Rig Veda Book no. 10 Hymn no. 85 V. no.30:

“Unlovely is the person is the husband who covers his thighs with the garment of his wife.” 
It is further mentioned in the Mahavir Charitra Act 2 Page 71 says:

When Purshuram comes, Rama tells his wife Sita that “He is our elder, please lower your gaze, and put on the veil. “

হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ, ভগবত গীতায় মহাঋষি ভুয়াস কালযুগে [অন্ধকার যুগে] পৃথিবীর অবস্থা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, নারীরা অনাবৃত মুখে বেশ্যাদের মতো বাজারে ঘুরে বেড়াবে

৬. আফগানিস্তানে প্রচলিত পর্দা প্রথা

আফগানিস্তানে পুরুষদের স্থানীয় পোশাকের পাশাপাশি সাধারণ নারীদের বিশেষ ধরনের পর্দা প্রথার চর্চা করতে দেখা যায়। এই ধারা ব্যাপকভাবে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে শুরু হয় ১৯৯৬ সালে, যখন তালিবান গোষ্ঠী দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করে। 

ফটোজার্নালিস্ট পলা ব্রন্সটিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আফগান নারীদের জীবনকে ফোকাস করে অনেক ছবি তুলেছেন। তা থেকে ‘আফগানি বৈশিষ্ট্যের ইসলামি পর্দার’ দিকে নজর দেওয়া যাক।

অফগান নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। ছবি: http://www.paulaphoto.com/afghanistan-between-hope-and-fear—the-book/Book-cover_final/

আফগান বৈশিষ্ট্যময় পর্দা প্রথার সঙ্গে উপরে উল্লেখিত ইহুদি প্রর্দা প্রথার গভীর মিল রয়েছে। এর কারণ কী? পরবর্তীতে তা আলোচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, ইহুদি সমাজে ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই ‘আপাদমস্তক আবৃত পর্দা প্রথা’ প্রচলিত রয়েছে।

৭. হাদীসের আলোকে পর্দা বা হিজাব (Islam of Hadith)


১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন, নারী হল সতর তথা আবৃত থাকার বস্তু। নিশ্চয়ই সে যখন ঘর থেকে  বের হয় তখন শয়তান তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। আর সে যখন গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করে তখন সে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বেশি নিকটে থাকে। —আলমুজামুল আওসাত, তবারানী

২. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন, ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নেকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে।
-সহীহ বুখারী ৪/৬৩, হাদীস : ১৮৩৮

৩. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত কাপড় ঝুলিয়ে রাখে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে তাকাবেন না।….মহিলারা এক হাত ঝুলিয়ে রাখবে, এর বেশি নয়।
-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪১১৭; জামে তিরমিযী ৪/২২৩; সুনানে নাসাঈ ৮/২০৯; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ১১/৮২

৪. রসুল সা. বলেছেন, তোমরা নারীদের নিকট যাওয়া থেকে বিরত থাক। এক আনসারী সাহাবী আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! স্বামী পক্ষীয় আত্মীয় সম্পর্কে আপনি কী বলেন? তিনি বললে, সে তো মৃত্যু। 
-সহীহ বুখারী ৯/২৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২১৭২; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১৭১; মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৯, ১৫৩

৫. হযরত আয়েশা রা. ইফ্কের দীর্ঘ হাদীসে বলেছেন-আমি আমার স্থানে বসে ছিলাম একসময় আমার চোখ দুটি নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আসসুলামী ছিল বাহিনীর পিছনে আগমনকারী। সে যখন আমার অবস্থানস্থলের নিকট পৌছল তখন একজন ঘুমন্ত মানুষের আকৃতি দেখতে পেল। এরপর সে আমার নিকট এলে আমাকে চিনে ফেলল। কারণ পর্দা বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে সে আমাকে দেখেছিল। সে তখন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলে ওঠে, যার দরুণ আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং ওড়না দিয়ে নিজেকে আবৃত করে ফেলি।

অন্য বর্ণনায় আছে, আমি ওড়না দিয়ে আমার চেহারা ঢেকে ফেলি। 
-সহীহ বুখারী ৫/৩২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৭৭০; জামে তিরমিযী, হাদীস : ৩১৭৯

৬.  উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম। উম্মুল মুমিনীন মায়মুনা রা.ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম উপস্থিত হলেন। এটি ছিল পর্দা বিধানের পরের ঘটনা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার সামনে থেকে সরে যাও। আমরা বললাম, তিনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখছেন না?! তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না?
-সুনানে আবু দাউদ ৪/৩৬১, হাদীস : ৪১১২; জামে তিরমিযী ৫/১০২, হাদীস : ২৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ ৬/২৯৬; শরহুল মুসলিম, নববী ১০/৯৭; ফাতহুল বারী ৯/২৪৮

৭. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমরা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম তখন আমাদের পাশ দিয়ে অনেক কাফেলা অতিক্রম করত। তারা যখন আমাদের সামনাসামনি চলে আসত তখন আমাদের সকলেই চেহারার ওপর ওড়না টেনে দিতাম। তারা চলে গেলে আবার তা সরিয়ে নিতাম।
-মুসনাদে আহমাদ ৬/৩০; ইবনে মাজাহ, ২৯৩৫

৮. আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, আমরা পুরুষদের সামনে মুখমণ্ডল আবৃত করে রাখতাম। 
-মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪

৯. ফাতিমা বিনতে মুনযির রাহ. বলেন, আমরা আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় থাকাকালে আমাদের মুখমণ্ডল ঢেকে রাখতাম।   
-মুয়াত্তা, ইমাম মালেক ১/৩২৮; মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪

১০. হযরত ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন, যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে সাক্ষাত করে তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান। -জামে তিরমিযী

১১. রসুল সা. বলেছেন, দুই শ্রেণীর দোযখী এখনও আমি দেখিনি। (কারণ তারা এখন নেই, ভবিষ্যতে আত্মপ্রকাশ করবে) এক শ্রেণী হচ্ছে ঐ সব মানুষ, যাদের হাতে ষাঁড়ের লেজের মতো চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করবে। (দ্বিতীয় শ্রেণী হচ্ছে) ঐ সব নারী, যারা হবে পোশাক পরিহিতা, নগ্ন, আকৃষ্ট ও আকৃষ্টকারী; তাদের মাথা হবে উটের হেলানো কুঁজের ন্যায়। এরা জান্নাতে যাবে না এবং জান্নাতের খুশবুও পাবে না অথচ জান্নাতের খুশবু তো এত এত দূর থেকে পাওয়া যাবে। -মুসলিম ২/২০৫, হাদীস : ২১২৮

১২. “তোমাদের কেউ কোনো নারীর প্রতি বিয়ের প্রস্তাব প্রদানের পর তাকে দেখলে কোন গুনাহ হবে না”।
-মুসানদে আহমাদ

১৩. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এক বর্ণনায় বলেন নারীর সাজ-পোশাকের বাহ্যিক দিক ছাড়া নারী-দেহের অন্য কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখানো অবৈধ।

১৪. ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (র.) আরও সুস্পষ্ট করে বলেন, নারীর জন্যে হাত, পা ও মুখমণ্ডল শুধুমাত্র মাহরাম পুরুষ ও নারীদের সামনে খোলা রাখা ইসলামি শরিয়ত সম্মত।

## পরবর্তীতে ইজমা-কিয়াসের আলোকে মুসলিম সমাজে প্রচলিত পর্দার আরও নির্দেশনা যুক্ত হয়। তার কিছু কারণ ধর্মীয় নেতারা এভাবে বলেছেন: 

ক) নারী মুখমণ্ডল খোলা রেখে বেপর্দা হলে আপনা আপনি ফিৎনা ও অনাচারে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। 
খ) পর্দাহীনতার ন্যায় অসৎ আচরণের কারণে নারীর অন্তর থেকে ক্রমে ক্রমে লজ্জা-শরম বিলুপ্ত হয়ে যায়।
গ) বেপর্দা নারীর কারণে পুরুষ ফিৎনা ও অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়।
ঘ) নারী যখন অনুধাবন করে যে, সেও পুরুষের মতো চেহারা খোলা রেখে স্বাধীনভাবে চলতে পারে; তখন সে পুরুষের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে চলাফেরা করতে লজ্জাবোধ করে না।

…………………………………………………

মুসলিম সমাজে পর্দার বিধান হিসেবে পালনের জন্য এমন আরও অসংখ্য হাদীস ও ইজমা-কিয়াসভিত্তিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। যাতে নানা বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পর্দা না করার ভয়াবহ পরিণাম জানানো হয়েছে। 
পর্দাহীন নারীকে জাহান্নামে কীভাবে শাস্তি দেওয়া হবে- তার বর্ণনাও রয়েছে।

এমনকি একজন বেপর্দা নারীকে দেখলে পুরুষকে জাহান্নামে কীভাবে মর্মান্তিক শাস্তি দেওয়া হবে—তার বিভৎস বর্ণনাও এসেছে  নানা গ্রন্থে।

প্রশ্ন হলো- এসব বর্ণনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও শরয়ী নির্দেশনা কী কুর’আন সম্মত? কুর’আনের নির্দেশ বা নির্দেশনা থাকলেই কেবল সংশ্লিষ্ট হাদীস, ফতোয়া ও নির্দেশনাকে গ্রহণ করা যেতে পারে। আর তা মান্য করাও কর্তব্য।
তবে আপাতত, উপরোক্ত হাদীস ও ফতোয়া থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে- ইহুদি সমাজের পর্দা প্রথা, আফগানিস্তানের পর্দা প্রথা এবং ইসলামি বিশ্বের ‘কঠোর পর্দা প্রথাই’ মূলত ইসলামি পর্দা!
উল্লেখ্য যে, এহেন পর্দা প্রথা কুর’আন নাযিলের আগে থেকেই ইহুদি সমাজ, খ্রিস্টান সমাজ, হিন্দু সমাজে প্রচলিত রয়েছে।
আল্লাহর রসুল দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার ৩০/৪০ বছর পর সেই ভুল পোশাকি ব্যবস্থাটি আমাদের মধ্যে ‘পর্দা’ নামে ঢুকে গেল!

বাস্তবতা কি?

এক্ষেত্রে, ‘সহীহ মুসলিম’ গ্রন্থের একটি হাদীস বেশ প্রাসঙ্গিক; যা রসুলুল্লাহর ভবিষ্যৎবাণী। 
নং ৬৫৩৯: আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- রসুল সা. বলেছেন, তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের নীতি-পদ্ধতি সম্পূর্ণ অনুসরণ করবে- বিঘতে বিঘতে ও হাতে হাতে, এমনকি তারা যদি সাপের গর্তে ঢুকে যায়- তখনও তোমরা তাদের অনুসরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহ্‌র রসুল! পূর্ববর্তীরা কি ইহুদি ও খ্রিস্টান? তিনি বললেন, তা ছাড়া আর কারা!

যায়িদ ইবনু আসলাম রহ. এই সনদে তার অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আবু ইসহাক, ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ, আতা ইবনু ইয়াসার রহ. এর সুত্রে যায়িদ ইবনু আসলাম রহ. অনুরূপ হাদীস উল্লেখ করেছেন।

হাদীস অনুসরণকারীদের দৃষ্টিতে এটি ‘সর্বসম্মত সহীহ’ হাদীস। 

দেখা যাচ্ছে, পর্দা-সংক্রান্ত নির্দেশনাও রসুল সা.-এর সূত্র ধরে এসেছে। আবার, রসুল সা. নিজেই সে বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন। পরস্পর বিপরীত এমন নির্দেশনা কীভাবে থাকতে পারে?

এখানেই মূলত যাচাই বাছাই করার গুরুত্ব দেখা দেয়। আর, মহান এ কাজের এজন্য আমাদের রয়েছে একটি ‘পরশ-পাথর’। যা খাঁটি বা ভেজাল সোনা আলাদা করে দেয়। সোনার চেয়েও দামী সেই সোনা খোঁজার যন্ত্র! একমাত্র সেই পরশ পাথরই কেয়ামত পর্যন্ত প্রকৃত মুসলিম উম্মাহ্‌কে ধারণ করে রাখবে, প্রকৃত ইসলামকে টিকিয়ে রাখবে। সেই রজ্জু ধরেই মুসলিম উম্মাহ দ্রুত গতিতে পৌঁছে যাবে জান্নাতে। প্রিয় নবী রসুল সা.-এর সঠিক হাদীস-গুলোকে ছেঁকে তুলতে পারে একমাত্র সেই পরশ-পাথর! 

আপনার-আমার কিংবা জগৎশ্রেষ্ঠ মনীষীদের মেধা ও কমন-সেন্স নয়; সেই পরশপাথর হলো- পবিত্র কুর’আন। যা মহাবিজ্ঞানময়- ওয়াল কুর’আনুল হাকীম!

৮. মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে পোশাক

এবার আমরা মহাগ্রন্থ আল কুর’আনের পোশাক-সংক্রান্ত আয়াতগুলোর দিকে দৃষ্টি দেবো। যা মুসলিম নর-নারীর জন্য অনুসরণীয় এবং অবশ্য পালনীয় বিধান।

সুরা নুর এর ৩০, ৩১ ও ৬০ নম্বর আয়াত এবং সুরা আহযাবের ৩২, ৩৩, ৫৩ ও ৫৯ নং আয়াত ছাড়া, কুর’আনের আর কোনও আয়াতে এই বিষয়ে আল্লাহর পরামর্শ পাওয়া যায় না। তার মধ্যে ৪টি আয়াত নবী পরিবারের জন্য; ৩টি আয়াত নারীদের জন্য (১টি আয়াত নবীর স্ত্রী ও নারীদের জন্য) এবং ১টি আয়াত পুরুষদের জন্য।

শুরুতেই মুমিন বা বিশ্বাসী পুরুষদেরকে দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশনা এসেছে।
সুরা নুর ৩০: বিশ্বাসী-নিরাপদ-ভালো পুরুষদের জানাও (قُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ), তাদের দৃষ্টিশক্তি সংযত রাখতে (يَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ) এবং তাদের যৌনাঙ্গ (وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْۗ) রক্ষা করতে; এটা তাদের জন্যে পবিত্রতর (ذٰلِكَ اَزْكٰى لَهُمْۗ); তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ভালোভাবে জানেন (اِنَّ اللّٰهَ خَبِيْرٌۢ بِمَا يَصْنَعُوْنَ)।

সুরা নুর ৩১: আর বিশ্বাসী-নিরাপদ-ভালো মেয়ে/নারীদের জানাও (وَقُلْ لِّلْمُؤْمِنٰتِ) তাদের দৃষ্টিশক্তি সংযত রাখতে (يَغْضُضْنَ مِنْ اَبْصَارِهِنَّ), তাদের যৌনাঙ্গ রক্ষা করতে (وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ) এবং তাদের ঝিনাত প্রদর্শন না করে (وَلَا يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ)- শুধুমাত্র তা-থেকে যা প্রকাশ পায় (اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا); আর তারা উপস্থাপন করুক (وَلْيَضْرِبْنَ) তাদের বক্ষের মাদকতা (seductiveness or alluring beauty) (بِخُمُرِهِنَّ عَلٰى جُيُوْبِهِنَّۖ); তারা তাদের ‘ঝিনাত’ প্রদর্শন না করে (وَلَا يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ) তাদের স্বামী অথবা পিতা অথবা শ্বশুর অথবা ছেলে অথবা স্বামীর ছেলে অথবা ভাই অথবা ভাইয়ের ছেলে অথবা বোনের ছেলে অথবা আপন নারীদের অথবা তাদের অধীনস্থদের অথবা যৌন কামনাহীন পুরুষ অথবা নারীদের গোপনীয়তা সম্পর্কে অসচেতন বালক ছাড়া (اِلَّا لِبُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اٰبَاۤىِٕهِنَّ اَوْ اٰبَاۤءِ بُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اَبْنَاۤىِٕهِنَّ اَوْ اَبْنَاۤءِ بُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اِخْوَانِهِنَّ اَوْ بَنِيْٓ اِخْوَانِهِنَّ اَوْ بَنِيْٓ اَخَوٰتِهِنَّ اَوْ نِسَاۤىِٕهِنَّ اَوْ مَا مَلَكَتْ اَيْمَانُهُنَّ اَوِ التَّابِعِيْنَ غَيْرِ اُولِى الْاِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ اَوِ الطِّفْلِ الَّذِيْنَ لَمْ يَظْهَرُوْا عَلٰى عَوْرٰتِ النِّسَاۤءِ ۖ); আর তারা সজোরে পা না-ফেলে (وَلَا يَضْرِبْنَ ببِأَرْجُلِهِنَّ) তাদের গোপন রাখা ঝিনাত বোঝানোর জন্য (لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِنْ زِيْنَتِهِنَّۗ); আর হে বিশ্বাসীরা, তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও (وَتُوْبُوْٓا اِلَى اللّٰهِ جَمِيْعًا اَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ)।

** অধিকতর বিশ্লেষণ:

১. *(وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰى جُيُوْبِهِنَّۖ)*
– ওয়াল ইয়াদরিবু-না (وَلْيَضْرِبْنَ): তারা উপস্থাপন/পেশ করে

– বি-খুমুরি-হিন্না (بِخُمُرِهِنَّ): তাদের মাদকতা-আবেশ-সহ/ seductiveness or alluring beauty

– আলা জুয়ুবি-হিন্না (عَلٰى جُيُوْبِهِنَّ): বক্ষের ওপর
The seductiveness or alluring beauty of their bosoms.

২:২৬ ইয়াদরিবা (يَضْرِبَ)- set forth : উপস্থাপন করা
– ৮:৫০ আর যদি তুমি দেখতে (وَلَوْ تَرٰٓى) যখন অস্বীকারকারী যাদের প্রাণ নেওয়া হয় (اِذْ يَتَوَفَّى الَّذِيْنَ كَفَرُوا) মালাইকারা উপস্থাপন করে (الْمَلٰۤىِٕكَةُ يَضْرِبُوْنَ) তাদের সত্তা/মুখ ও তাদের পিঠ (وُجُوْهَهُمْ وَاَدْبَارَهُمْۚ ) এবং আস্বাদন করে সেই জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি (وَذُوْقُوْا عَذَابَ الْحَرِيْقِ)!

– ১৩:১৭ তে দুই বার আছে- এভাবে আল্লাহ উপস্থাপন করেন (كَذٰلِكَ يَضْرِبُ اللّٰهُ)

– ১৪:২৫ তার রবের অনুমতিতে তার ফর দেয় প্রত্যেক সময় (تُؤْتِيْٓ اُكُلَهَا كُلَّ حِيْنٍ ۢبِاِذْنِ رَبِّهَاۗ) এবং আল্লাহ উপস্থাপন করেন দৃষ্টান্তগুলো মানুষের জন্য (وَيَضْرِبُ اللّٰهُ الْاَمْثَالَ لِلنَّاسِ) যাতে তারা স্মরণ রাখে ( لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُوْنَ)।

– ১৪:২৫ তার রবের অনুমতিতে তার ফল দেয় প্রত্যেক সময় (تُؤْتِيْٓ اُكُلَهَا كُلَّ حِيْنٍ ۢبِاِذْنِ رَبِّهَاۗ) এবং আল্লাহ উপস্থাপন করেন দৃষ্টান্তগুলো মানুষের জন্য (وَيَضْرِبُ اللّٰهُ الْاَمْثَالَ لِلنَّاسِ) যাতে তারা স্মরণ রাখে ( لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُوْنَ)।

– ১৬:৭৫, ৭৬, ১৬:১১২ দ্বরাবাল্লাহু মাছালা (ضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا) আল্লাহ দৃষ্টান্ত দেন/ উপস্থাপন করেন

২. (وَلَا يَضْرِبْنَ ببِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِنْ زِيْنَتِهِنَّۗ)
– ওয়া লা ইয়াদরিবু-না (وَلَا يَضْرِبْنَ): আর তারা উপস্থাপন/পেশ করে না
– বি-আরজুলি-হিন্না (ببِأَرْجُلِهِنَّ): তাদের পদদ্বয় সহ
– লি-ইয়ু’লামু (لِيُعْلَمَ): জানানোর জন্য
– মা ইয়ুখফি-না (مَا يُخْفِيْنَ): যা তারা গোপন রাখে
– মিন ঝিনাতি-হিন্না (مِنْ زِيْنَتِهِنَّ): তাদের আকর্ষণীয় সৌন্দর্য থেকে

#ফুরজ (فُرُوْجَ, বহুবচন) শব্দের অর্থ- to open, cleave, gap, space between the legs, pudenda, womb, chastity। অর্থাৎ, শরীরের ভাঁজ, ফাঁক, দুই পায়ের মাঝের ফাঁক, যৌনাঙ্গ ইত্যাদি।
#আঝকা (أَزْكَىٰ) বা ঝা-কা-ইয়া শব্দের অর্থ Purer, More righteous পবিত্র, আরও সঠিক। 
#গুদ্দু (غُضُّوْ) বা (غ ض ض) Lower the eyes to the ground, look down, turn the eyes from  দৃষ্টি সংযত রাখা, চোখ নামিয়ে রাখা। (আক্ষরিক অর্থ)


সুরা নুর ৬০: আর নারীদের মধ্যে রজোনিবৃত্ত যারা (وَٱلْقَوَٰعِدُ) বিয়ের আশা করে না (لَا يَرْجُوْنَ نِكَاحًا), তাদের কোনো পাপ (جُنَاحٌ) নেই যদি তারা পোশাক খুলে রাখে (يَّضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ) আকর্ষণীয় সৌন্দর্য দিয়ে প্রদর্শন ব্যাতিরেকে/ ছাড়া (مُتَبَرِّجٰتٍۢ بِزِيْنَةٍ); তবে তাদের জন্য বিরত থাকা (يَسْتَعْفِفْنَ) উত্তম; আল্লাহ্ সব শোনেন সব জানেন (سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ)। (২৪:৬০) 

সুরা আহযাব ৩২: হে নবীর স্ত্রীগণ (يٰنِسَاۤءَ النَّبِيِّ) তোমরা অন্য নারীদের মতো না; যদি তোমরা স্রষ্টা-সচেতন হও (ٱتَّقَيْتُنَّ) তাহলে কোমল কথা বলো না- হৃদয় (قَلْبِهِۦ) রোগাক্রান্ত যার সে আকৃষ্ট হয় (فَيَطْمَعَ); বরং তোমরা কথা বলো ন্যায়সঙ্গতভাবে (مَّعْرُوفًا)। (৩৩:৩২)

আহযাব ৩৩: আর তোমরা তোমাদের ঘরে থাকো এবং অতীত অজ্ঞ-যুগের প্রদর্শনীর মতো (تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ) প্রদর্শন কোরো না (وَلَا تَبَرَّجْنَ); আর তোমরা সালাত কায়েম করো ও পরিশুদ্ধ হও এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করো; ঘরের বাসিন্দারা (اَهْلَ الْبَيْتِ) আল্লাহ শুধু চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা (ٱلرِّجْسَ) দূর করতে এবং তোমাদেরকে পবিত্র করবেন (يُطَهِّرَكُمْ) সম্পূর্ণ পবিত্র (تَطْهِيرًا)। (৩৩:৩৩)

সুস্পষ্ট বিষয় এই যে, এই নির্দেশ রসুল সা.-এর স্ত্রীদের জন্য প্রযোজ্য। এমনকি পরের ৫৩ নং আয়াতের নির্দেশও শুধুমাত্র রসুল সা.-এর পরিবারের জন্যই নাযিল করা হয়।

সুরা আহযাব ৫৩: হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত খাবার প্রস্তুতির জন্যে অপেক্ষা না করে খাবার গ্রহণের জন্যে নবীর ঘরে প্রবেশ করোনা। তবে যখন ডাকা হয় তখন প্রবেশ করো। আর যখনই খাবার গ্রহণ শেষ হয়, তখন চলে যেয়ো কথাবার্তায় মশগুল না হয়ে। কারণ তোমাদের এ ধরণের আচরণ নবীকে কষ্ট দেয় এবং তোমাদের উঠিয়ে দিতে সে সংকোচ বোধ করে। তবে আল্লাহ্ সত্য বলতে সংকোচ বোধ করেন না। তোমরা নবী পত্নীদের কাছে কিছু চাইলে হিজাবের অন্তরাল থেকে চাইবে। এ পন্থাই তোমাদের এবং তাদের অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্র। তোমাদের কারো জন্যে সংগত নয় আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর মৃত্যুর পর কখনো তাঁর স্ত্রীদের বিয়ে করা। আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের এসব কাজে জড়ানো গুরুতর অপরাধ। (৩৩:৫৩)

সুরা আহযাব ৫৯: হে নবী! তোমার স্ত্রী, কন্যা এবং মু’মিনদের নারীদের বলো- বহিরাবরণের (جَلَٰبِيبِهِنَّ) কিছুটা তাদের উপর টেনে দিতে (يُدْنِينَ); এটা অধিকতর ভালো (أَدْنَىٰٓ) তাদের চেনা যাবে (يُّعْرَفْنَ) আর বিরক্ত করা হবে না (يُؤْذَيْنَ); এবং আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল পরম দয়ালু (غَفُوْرًا رَّحِيْمًا)। (৩৩:৫৯)

৯. এসব আয়াতে যা বলা হলো-

১. পুরুষ ও নারীকে দৃষ্টিশক্তি সংযত রাখতে হবে। অর্থাৎ দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত মন-মনাসিকতা ও আচরণ সংযত হতে হবে। অন্যরা যে যেভাবেই থাকুক না-কেন মানুষকে সংযত ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যৌনাঙ্গ বা প্রজনন অঙ্গ রক্ষা করতে হবে। যৌনাঙ্গ রক্ষার অর্থ- প্রজনন অঙ্গের সঠিক/উপযুক্ত ব্যবহার করা।
২. সৌন্দর্যের চূড়ান্ত আকর্ষণটি প্রকাশের জন্য জোর-পদচারণা না-করা ভালো।
৩. তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতিতে বিশ্বাসী নারীদের বলা হয়েছিল, বহিরাবরণের দীর্ঘায়িত অংশ শরীরে টেনে নিতে- যাতে তাদেরকে চেনা যায়। এতে তাদের বিরক্ত করা হতো না। এই নির্দেশনাটি নবীর স্ত্রী ও সমসাময়িক বিশ্বাসী নারীদের জন্য বলা হয়েছিল।
৪. বিয়ের ইচ্ছা/আকাঙ্ক্ষা/চাহিদা-মুক্ত এবং নিজের ঝিনাত বা সৌন্দর্যের চূড়ান্ত আকর্ষণটি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ছাড়া- রজোনিবৃত্ত নারীরা প্রয়োজনে পোশাক খুলে রাখতে পারে।

আর, যেহেতু মহাগ্রন্থে কোনো পর্দা-সংক্রান্ত বিষয়ই নাই, সেহেতু ‘পর্দা প্রথা’ পালন করা বা না-করার সঙ্গে জান্নাতে জাহান্নামের সম্পর্ক উল্লেখই করা হয়নি!

সর্বসাকুল্যে এই ৩টি আয়াতেই প্রয়োজনীয় সব কথা বলেছেন আল্লাহ

কুর’আনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে, কেউ শালীনতার সীমা রক্ষা না-করলে তাকে বাধ্য করা, শাস্তি দেওয়া, তিরস্কার করা, প্রকাশ্যে বা গোপনে কিছু বলা, সুযোগ-সুবিধা কম-বেশি দেওয়া, তার বিরুদ্ধে কিছু চিন্তা করা ও ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ নাই। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। 

দুঃখের বিষয় হলো- পুরুষদের এমন কোনও বিশেষ পোশাকি বৈশিষ্ট্য নাই।

আর নিশ্চয়ই আমরা আল-কুরআনকে সহজ করেছি উপদেশ নেওয়ার জন্য, অতঃপর কে উপদেশ গ্রহণকারী! ৫৪:১৭

আর এভাবে মহান রবের নির্দেশ মানলেই দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা ধরা দেবে। “…যাতে তোমরা সফল হও।” নুরের ৩১ আয়াতের শেষাংশে এ কথাই বলা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *