তকদির বা পূর্ব-নির্ধারিত ভাগ্য !?!
কুর'আন রিসার্চ সেন্টার-কিউআরসি
১.
মানুষের ভাগ্য কী পূর্বনির্ধারিত? মানুষের ভাগ্যে যা লিখে দেওয়া হয়েছে, মানুষ কি তার বাইরে কিছু করতে পারে? অথবা, মানুষ যা পায় তা কি আগে থেকেই তার জন্য লিখে দেওয়া আছে? চেষ্টা করুক আর না-করুক, মানুষ কি তাই অর্জন করে?
এমন সব ধারণা ও বিশ্বাসের যৌক্তিকতা খণ্ডন করা হবে।
কদর, তকদির বা পূর্ব-নির্ধারিত ভাগ্য সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাস হলো- মানুষের ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত। পাশাপাশি, তকদিরের ভালো মন্দের প্রতি বিশ্বাস- মৌলিক বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু, বহুল প্রচলিত ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা এই ধারণা কি কুর’আন সমর্থন করে? অথবা, এই ধারণা ও বিশ্বাস কি সাধারণ যুক্তিবুদ্ধি সঙ্গত?
এ বিষয়ে যাবতীয় ভুল বিষয় ও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি মহাগ্রন্থ আল-কিতাব থেকে সুস্পষ্ট করা হলো।
প্রথমত, সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ‘তকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস’ বা ‘পূর্ব-নির্ধারিত ভাগ্যে বিশ্বাস করা বা ঈমানে মুফাসসাল নামে যা শিশু অবস্থাতেই সন্তানের মন-মগজে গেঁথে দেওয়া হয়- তা সম্পূর্ণরূপে কুর’আন সমর্থিত নয়। বিশেষ করে শেষাংশটি। যেখানে বলা হয়েছে- (واليوم الاخر والقدر خيره وشره من الله تعالى ) ওয়াল ক্বাদরি খইরিহি ওয়া শাররিহি মিনাল্লাহি তা‘আলা..।
বরং, আল-কুর’আনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-
রসুল বিশ্বাস করেছে- তার রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কাছে (بِمَآ اُنْزِلَ اِلَيْهِ) এবং বিশ্বাসীগণও (وَٱلْمُؤْمِنُونَ); সবাই বিশ্বাস করেছে আল্লাহকে, তাঁর মালাইকাদের, তাঁর কিতাবসমূহ ও তাঁর রসুলদের- আমরা পার্থক্য করি না তাঁর রসুলদের মধ্যে (لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهٖ); আর তারা বলে আমরা শুনলাম ও মানলাম (سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا); আমাদের রব আমরা ক্ষমা চাই এবং আপনার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন (غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَاِلَيْكَ الْمَصِيْرُ)। {২:২৮৫}
অর্থাৎ, বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে- আল্লাহ, মালাইকা, পূর্বের সব কিতাব ও রসুলগণের প্রতি। এর সঙ্গে তকদির বা পূর্ব-নির্ধারিত ভাগ্যের ধারণা যোগ করলো কে? সেই অধিকার বা সুযোগ আল্লাহ কাউকে দিয়েছেন কী?
অবশ্যই না।
দ্বিতীয়ত, মানুষ (ও জিন ছাড়া) মহাবিশ্ব-জগতের তকদির বা কদরের বিষয়ে কী বলা হয়েছে? হ্যাঁ, অন্য সব সৃষ্টির ভাগ্য বা গতিপথ নির্ধারিত।
সামাওয়াত ওয়াল আরদ বা মহাবিশ্বজগৎ সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে সব কিছু ছিল অন্ধকার। সে সময়ের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে ‘সুরা কদরে’।
অন্ধকার সে সময় (The initial configuration of the universe) ইনিশিয়াল কনফিগারেশন অফ ইউনিভার্স স্থাপন করা হয়েছিল। একে আমরা বলতে পারি (natural law)
প্রাকৃতিক আইন স্থাপন/নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই মহাবিশ্বজগত অসীম-দীর্ঘ সময়ে রূপান্তর হতে হতে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। মহান আল্লাহ জানিয়েছেন- তিনি এমন ছয়টি পর্যায়ে মহাবিশ্বের গঠন সম্পন্ন করেছেন। (মহাবিশ্ব সৃষ্টির ছয়টি পর্যায়-সহ আরও পড়ুন এখানে)
এই (natural law) প্রাকৃতিক আইন কী?
যেমন ধরুন হাইড্রোজেন গ্যাস (H2)। দুই অণু হাইড্রোজেনের সঙ্গে এক অণু অক্সিজেন মিলে দৃশ্যমান পদার্থ পানি তৈরি হয়। আবার, কার্বন ও হাইড্রোজেন তৈরি করে হাইড্রোকার্বন (a ompound of hydrogen and carbon, such as any of those which are the chief components of petroleum and natural gas.) বা পেট্রোল তৈরি হয়। (flammable liquid hydrocarbons)। এটাই হলো হাইড্রোজেনের চরিত্র বা ধর্ম বা আইন বা কদর।
এই হাইড্রোজেন আবার বাতাসে উড়ে যায়, আগুনে জ্বলে। হাইড্রোজেন কেন এমন আচরণ করে? এই আচরণ করতে কি সে বাধ্য? হাইড্রোজেনকে এই আইন, নিয়ম বা বিধান কে দিয়েছে? এইসব প্রশ্নের একটিই উত্তর।
- পাঠানো হয়েছিল মালাইকা ও ‘রুহ’ রবের নির্দেশে- প্রত্যেক কাজের জন্য। {৯৭:৪}
রুহ হলো- মহান প্রভুর আদেশ/নির্দেশ। {১৭:৮৫}
হাইড্রোজেনের মতো ১০৯টি মৌলিক পদার্থ আবিষ্কৃত হয়েছে। এই সবগুলো মৌলিক পদার্থের নিজস্ব ভৌত গুণাবলী, নিজস্ব চরিত্র বা আইন (কদর) আছে। যা একে-অপরের সঙ্গে বিভিন্ন অনুপাতে যুক্ত হয়ে নানা ধরনের পদার্থ বা বস্তু তৈরি করছে।
এসব জিনিসের আবার নিজস্ব প্রাকৃতিক আইন (natural law) আছে। এমন ৯৬টি মৌলিক পদার্থ সু-নির্ধারিত অসংখ্য প্রাকৃতিক আইন অনুসরণ করে আল্লাহর নির্দেশে পৃথিবী গঠন করেছে। তাই দেখা যায়, নিখুঁত এই মহাবিশ্বের অদৃশ্য এক অংশে পৃথিবীও যেন নিখুঁত একটি গ্রহ- যা মানুষ-সহ অন্যান্য প্রাণের বিকাশে ‘একমাত্র উপযুক্ত স্থান’।
পৃথিবীর পাশাপাশি, অন্যান্য উপগ্রহ, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সিরও একই বিকাশ পদ্ধতি দেখা যায়। মহান রবের বেঁধে দেওয়া প্রাকৃতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে নিখুঁত অসীম মহাবিশ্ব। মানুষের দৃষ্টিতে তা অসীম হলেও মহাপ্রভু বলছেন- তা সাত স্তরে সজ্জিত!
বিশ্বজগৎ সৃষ্টির এক পর্যায়ে তৈরি হয় ধোঁয়া ও ঘন পদার্থ। তা পুঞ্জিভূত হয়ে নিউক্লিয়ার ফিউশান ও ফিশান বিক্রিয়ার মাধ্যমে
গড়ে ওঠে আরও ভারী ও গ্যাসীয় পদার্থ। এক পর্যায়ে জন্ম নেয় নক্ষত্র। সেই নক্ষত্রের বিস্ফোরণে সৃষ্টি হয় আরও গ্রহ ও কৃষ্ণগহ্বর জাতীয় পদার্থ। নক্ষত্রগুলো একত্রিত হয়ে তৈরি হয়েছে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ। অসংখ্য গ্যালাক্সি একত্রিত হয়ে গড়ে উঠেছে লোকাল ক্লাস্টার গ্রুপ। এই সব বস্তু ছুটে চলেছে সময়ের চেয়েও দ্রুত গতিতে। ক্রমশ: বিকশিত হচ্ছে মহাবিশ্বের স্থান-কাল-পাত্র ও সময়। একারণে মহাবিশ্বে এত নক্ষত্র থাকার পরও বজায় রয়েছে গাড় অন্ধকার। সবকিছু হচ্ছে সুনির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ধারণ করে দেওয়া আইনের ভিত্তিতে (The initial configuration of the universe) ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে নিখুঁত মহাবিশ্ব (fine- tuned universe)।
সুনির্ধারিত এই আইনের ভিত্তিতে মহাবিশ্বজগতের ভাগ্যও কঠিনভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে। মহাপ্রভু নিজেকে বলছেন- তিনি “মালিকি ইয়াওমিদ্দিন”। যেদিন সবকিছু নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল- একমাত্র তিনিই তা করতে পারেন ও করেছেন। আবারও একবার তিনি তা করবেন। তিনি সেই “আইন নির্ধারণ দিবসের” মালিক।
আরবি ‘দিন’ শব্দের অর্থ- আইন। আল্লাহ আইনের দিনের মালিক। হিব্রু ও আরামাইক ভাষাতেও ‘দিন’ শব্দটির অর্থ- আইন। ‘দিনি বায়েত’ বলতে ‘আদালত’ বোঝানো হয়।
পাশাপাশি ‘দিন’ শব্দ দিয়ে judgement day বা বিচার দিবস অর্থটিও করা হয়। যা একটি প্রতিশব্দ। তবে, আমাদের দৃষ্টিতে মৌলিক অর্থটিই অনেক বেশি অর্থপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত। কারণ, মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের একটি পর্যায়ে বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch) বা দ্বিতীয় নতুন শুরুর বিষয়টি তাত্ত্বিক-ভাবে সামনে চলে আসে। যা কুর’আন অনুযায়ী কিয়ামত বা অবধারিত ঘটনা। সবকিছু গুটিয়ে সংকুচিত হয়ে যাওয়ার দিন। যেই সময়টির পর আবারও নতুন করে শুরু হবে দ্বিতীয় পর্যায়।
সেদিন তিনি পুনরায় নতুন মহাবিশ্বের সব আইন নির্ধারণ করে দেবেন ‘লাইলাতুল কদরের’ মতো করে। শুধুমাত্র মানুষ ও জিন জাতির ভাগ্য ছাড়া। মানুষ ও জিন প্রভুর দেওয়া স্বাধীনতার শক্তি (ইবাদত) ব্যবহার করে নিজের ভাগ্য নিজেই রচনা করেছে।
২.
হে মানুষ! তুমি কৃতকর্মের বোঝা নিয়ে ফিরে চলছো তোমার মালিকের দিকে; এ এক অবধারিত প্রত্যাবর্তন; সামনে এগিয়েই তাঁর সাক্ষাৎ পাবে। {৮৪:৬}
আল্লাহ কোনও ব্যক্তির উপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না; তার ভালো উপার্জনের (কৃতকর্মের) প্রতিফল সে-ই পাবে, আর তার মন্দ উপার্জনের (কৃতকর্মের) প্রতিফলও তাকেই ভোগ করতে হবে। {২:২৮৬}
……..তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো, অবশ্যই
আল্লাহ তোমাদের কর্মের উপর দৃষ্টি রাখেন। {২:২৩৩,২৬৫}
বলো- আমি কি আল্লাহকে ছাড়া অন্য কোনো রব খুঁজবো? অথচ তিনিই তো সব কিছুর রব; প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্যে দায়ী; কেউই অন্য কারও বোঝা বহন করবে না। {৬:১৬৪}
পাশাপাশি, মহান রব্বুল আলামিন সতর্ক করে বলছেন-
আল্লাহ মোটেও গাফিল নন তোমাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। {২:৭৪,৮৫}
হ্যাঁ, যারাই কামাই করে পাপকর্ম এবং তাদের ঘেরাও করে ফেলে তাদের পাপরাশি, তারাই হবে ‘আসহাবুন নার’ (আগুনের অধিবাসী), সেখানে থাকবে তারা চিরকাল। {২:৮১}
এরাই হলো সেই সব মানুষ, যাদের জন্যে তাদের উপার্জনের (কর্মের) ভিত্তিতে যথাযথ অংশ রয়েছে; আর আল্লাহ তো দ্রুত হিসাব সম্পন্নকারী। {২:২০২}
তাদেরই আবাস হবে জাহান্নাম তাদের কৃতকর্মের কারণে। {১০:৮}
আর যারা কামাই করবে মন্দ কর্ম, তাদের প্রতিফলও হবে অনুরূপ মন্দ; তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে জিল্লতি… {১০:২৭}
২.ক. প্রথম পর্যবেক্ষণ
আমরা প্রতিটি মানুষের কর্ম ( طَائِرَهُ) তার গলায় ঝুলিয়ে রেখেছি এবং আমরা কিয়ামতের দিন তার জন্যে বের করবো একটি কিতাব (كِتَابًا
a record আমলমানা), সেটি সে পাবে উন্মুক্ত। {১৭:১৩}
এখানে ত্বয়িরাহু طَائِرَهُ বলতে- কর্ম/ভাগ্য/fate ইত্যাদি শব্দ অনুবাদে লেখা হয়েছে। কিন্তু গোটা বাক্য থেকে বোঝা যাচ্ছে- পুনরুত্থান দিবসে কিতাব বা রেকর্ড হওয়া বই ধরিয়ে দেওয়া হবে। যদি আগেই কর্ম বা
ভাগ্য লিখে দেওয়া হয়- তাহলে কিতাবে রেকর্ড হবে কী?
অর্থাৎ, ত্বয়িরহু طَائِرَهُ অর্থ কর্ম/ভাগ্য/ fate নয়। হতে পারে এমন শূন্য কোনও কিতাব- যাতে মানুষের কর্মকাণ্ড লিখিত হয়ে যায়। আর, মানুষ যদি অপকর্মের জন্য ক্ষমা চায় ও সংশোধন হয়, আল্লাহ সেই লেখা বা রেকর্ড পরিবর্তন করে দেন- মুছে দেন।
শুধুমাত্র এই অর্থ ছাড়া- বাক্যের গঠন যৌক্তিক হয় না।
যেমন আল্লাহ বলেছেন-
যারা ঈমান এনেছে ও আমলে সালেহ করেছে, আমরা অবশ্যই তাদের থেকে মুছে দেবো তাদের সব মন্দকর্ম এবং তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম আমলের ভিত্তিতে। {২৯:৭}
তখন যার কিতাব (কৃতকর্মের রেকর্ড) দেয়া হবে তার ডান হাতে, সে বলবে- নাও পড়ে দেখো আমার কিতাব (রেকর্ড)। {৬৯:১৯}
ফলে সে এমন জীবন যাপন করবে, যাতে সে রাজি খুশি ও সন্তুষ্ট থাকবে; সে থাকবে মর্যাদাপূর্ণ জান্নাতে। {৬৯:২১,২২}
কিন্তু যাকে তার কিতাব (রেকর্ড) দেওয়া হবে তার বাম হাতে, সে বলবে- হায়, আমার ধ্বংস, আমাকে যদি দেওয়া না হতো আমার কিতাব! {৬৯:২৫}
তবে যার কিতাব (রেকর্ড) দেওয়া হবে তার পেছন দিক থেকে; সে ডাকবে মৃত্যুকে এবং সে প্রবেশ করবে সায়িরে (জ্বলন্ত আগুনে)। {৮৪:১০-১২}
২.খ. দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণ
বর্তমান সময় অনেক মানুষ বলে থাকেন, আল্লাহ চাইলে তার জীবনে নানা অর্জন হতো; আবার আল্লাহ
না-দিলে এমন বড় বিপদ হতো না। আল্লাহ ইচ্ছা না-করলে, নানা রকম দুর্যোগ, বালা-মুসিবত
থেকে তারা বেঁচে থাকতে পারতো। এমনকি আল্লাহ চান-না বলেই তার জীবনে নানা কিছু থেকে বঞ্চিত হয়। মূলত, এ সবই তথাকথিত তকদির বা ভাগ্যের অজুহাতে মহান রব্বুল আলামিনের প্রতি মিথ্যা অভিযোগ। যেখানে অন্য মানুষের প্রতি মিথ্যা-অভিযোগ বা অপবাদ দিতে আল্লাহপাক কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন, সেখানে মানুষ স্বয়ং মহাজগতের প্রভুর প্রতিই ‘অজ্ঞতার কারণে সৃষ্ট অবিশ্বাস’ থেকে অভিযোগ-অপবাদ
করে থাকে। রসুল সা.এর সময়ও মানুষ আল্লাহর প্রতি এমন অযৌক্তিক অভিযোগ করতো। দেখুন, মহাপ্রভু কী বলেছিলেন তখন? আল্লাহর সেসব বক্তব্য এখনও সমভাবে প্রযোজ্য।
পৌত্তলিকরা বলে, আল্লাহ যদি চাইতো তাহলে আমরা মুর্তি-পূজা করতাম না; তাহলে আমরা এখন যা করছি, সেটা আল্লাহর ইচ্ছাতেই করছি! {১৬:৩৫,৩৬}
যদি আল্লাহ কর্তৃক ভাগ্য বেঁধে দেওয়ার দাবি সঠিক হয়, তাহলে মুশরিকদের এই দাবিটি সত্য হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ বলছেন,
রসুল যদি না পাঠাতাম, তাহলে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্যে যদি তাদের কোনো দুর্যোগ আসতো তারা বলতো- আমাদের প্রভু! আপনি কেন আমাদের কাছে একজন রসুল পাঠালেন না? পাঠালে তো আমরা আপনার আয়াতের ইত্তিবা (অনুসরণ) করতে পারতাম এবং আমরা মুমিন হয়ে যেতাম। {২৮:৪৭}
অর্থাৎ, এটাই সুস্পষ্ট যে, মানুষের কর্মপদ্ধতি ও যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত বা ভাগ্য আল্লাহপাক নির্ধারণ করে দেন নি। তারা যেসব অপকর্ম করছিল, তা নিজের স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মশক্তি দিয়েই করছিল। মহান আল্লাহ বরং রসুলের মাধ্যমের বার্তা পাঠিয়ে এমন চিন্তাধারার মানুষদের সঠিক পথে আসার সুযোগ করে দিয়েছেন।
পাশাপাশি, যারা পৃথিবীতে সচেতন হয়ে, ঈমানের ভিত্তিতে ভালো কাজ করবে, আল্লাহপাক তাদের ভালোকাজগুলো সংরক্ষণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
….আল্লাহ মুমিনদের কর্মফল বিনষ্ট করেন না। {৩:১৭১}
যারা কিতাবকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ও সালাত কায়েম করে,
আমরা এসব পুণ্যবানদের
কর্মফল নষ্ট করি না। {৭:১৭০}
এবং,
…..নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কল্যাণপরায়নদের কর্মফল নষ্ট করেন না। {৯:১২০}
৩.
এমতাবস্থায়, পৃথিবীতে যত বিপদ-আপদ ও দুর্যোগ দেখা দেয়- সেসব কি আল্লাহ দেন? সেসব সমস্যা কি আল্লাহ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেন? মানুষের ভাগ্য যদি তিনি নির্ধারণ করে থাকেন- তাহলে সেসব বিপদ-দুর্যোগও তাঁকেই চাপিয়ে দিতে হবে। কিন্তু, অসংখ্য আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ মানুষের চিন্তা ও কর্মকাণ্ডে ব্যাপক স্বাধীনতা দিয়েছেন, চিন্তা বাস্তবায়নের মতো শক্তি ও ক্ষমতা দিয়েছেন। তাহলে নানা বিপদ-মুসিবত কীভাবে আসে? তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর আল-কিতাবে লিখে দিয়েছেন। তারপরও, আশ্চর্যজনক কারণে বেশিরভাগ মানুষ তা বিশ্বাস করছে না। তিনি বলেন, পৃথিবীতে সব বিপদ-দুর্যোগ মানুষ তার কর্ম দিয়েই অর্জন করে থাকে।
তাদের কৃতকর্মের জন্যে যখন তাদের উপর কোনো মসিবত আপতিত হবে, তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে?……….. {৪:৬২}
বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে স্থলে ও সমুদ্রে মানুষের কর্মফলের কারণে, এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাদের কিছু কাজের শাস্তি তাদের দেন, যাতে তারা ফিরে আসে। {৩০:৪১}
তোমাদের জীবনে যে দুর্দশা-দুর্ঘটনা ঘটে, তা তোমাদেরই হাতের কামাই; আর অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমাই করে দেন। {৪২:৩০}
৪.
রব্বুল
আলামিনের সুস্পষ্ট এমন বক্তব্যের পর অন্ধ-বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে মানুষ
দুনিয়ার জীবনের অধ্যায় শেষ করে পরবর্তীতে হাশরের ময়দানে গিয়ে সমবেত হবে। তখন কী কী
ঘটনা ঘটবে? তখন আসলে অনেক কিছু ঘটবে। কী কারণে কী ঘটবে- সেসব অতীব প্রয়োজনীয় তথ্য
আল্লাহ রব্বুল আলামিন আল-কুর’আনে উল্লেখ
করে দিয়েছেন। চলুন দেখা যাক।
কিয়ামতের দিন কী কী হবে?
কিয়ামতের সময় আমরা স্থাপন করবো ন্যায়বিচারের দণ্ড; তখন কারো প্রতি বিন্দুমাত্র অন্যায় করা
হবে না। কারো কর্ম যদি শস্য পরিমাণ ওজনেরও হয়, তাও আমরা হিসাবের আওতায় আনবো; হিসাবগ্রহণকারী হিসেবে আমরাই যথেষ্ট। {২১:৪৭}
যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জবান, তাদের হাত, তাদের পা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে। {২৪:২৪}
সুতরাং আজকের এই দিনের সাক্ষাতের কথা তোমরা যেহেতু ভুলে গিয়েছিলে তাই আস্বাদন করো আযাব; আমরাও তোমাদের ভুলে গেলাম, সুতরাং তোমাদের কর্মকাণ্ডের ফল হিসেবে আস্বাদন করো চিরস্থায়ী আযাব। {৩২:১৪}
দুর্বল করে রাখা লোকেরা ক্ষমতাদর্পীদের বলবে- তোমরাই তো দিনরাত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলে, আমাদের নির্দেশ দিয়েছিলে যেনো আমরা আল্লাহর প্রতি কুফুরি করি এবং তাঁর সাথে শরিক করি। যখন তারা আযাব দেখতে পাবে, তখন তারা
লজ্জা ও অনুতাপ গোপন করবে এবং আমরা কাফিরদের গলায় শিকল পরিয়ে দেবো; তারা যেসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলো,
তাদেরকে তারই প্রতিফল দেওয়া হবে মাত্র। {৩৪:৩৩}
যখন সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে আসবে এবং সবাইকেই তার কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনো প্রকার যুলুম করা হবে না। {১৬:১১১}
এবং তোমরা যেসব কর্মকাণ্ড করতে তারই প্রতিদান পাবে। {৩৭:৩৯}
তাদের উপর আপতিত হয়েছিল তাদের সব মন্দ অর্জন আর মন্দ কর্মকাণ্ড। এদের মধ্যেও যারা যুলুম করে তাদের উপরও তাদের মন্দ কৃতকর্মের ফল আপতিত হবে এবং তারা তা ঠেকাতে পারবে না। {৩৯:৫১}
তুমি দেখতে পাবে এই যালিমরা তাদের
কৃতকর্মের জন্যে ভীত আতঙ্কিত। {৪২:২২}
সেদিন তুমি দেখবে, প্রতিটি উম্মত ভয়ে নতজানু; প্রতিটি উম্মতকে ডাকা হবে তাদের কিতাবের (আমলনামার) দিকে; বলা হবে- আজ প্রতিদান ও প্রতিফল দেওয়া হবে তোমাদের দুনিয়ার জীবনের কৃতকর্মের। {৪৫:২৮}
এতে প্রবেশ করো, এর আযাব তোমরা সহ্য করতে পারো বা না–পারো দুটোই সমান; তোমাদেরকে তো তোমাদেরই কৃতকর্মের প্রতিফল দেওয়া হলো। {৫২:১৬}
যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে পুনরুত্থিত করবেন, সেদিন আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন; আল্লাহ তার হিসাব রেখেছেন, কিন্তু তারা তা ভুলে গেছে; আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী। {৫৮:৬}
এদের অবস্থা তাদের কিছু আগের লোকদের মতো, যারা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করেছে; এ ছাড়া তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। {৫৯:১৫}
৫.
দুনিয়ার জীবনে মন্দ ও ভুল কাজে জড়িত থাকা লোকদের পাশাপাশি যারা জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামতের অধিকারী হবে- তাদের সে প্রশান্তির জন্য কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ? কেন তারা জান্নাত লাভ করবে? শুধুই কি আল্লাহর অনুগ্রহ? নাকি, আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানবজাতিকে আরও কিছু জানিয়েছেন? চলুন দেখা যাক।
পক্ষান্তরে যারা ঈমান আনবে ও আমলে সালেহ করবে, তারাই হবে জান্নাতের অধিবাসী, চিরকাল থাকবে তারা সেখানে; আমরা কাউকেও তার সাধ্যের বেশি বোঝা অর্পণ করি না। {৭:৪২}
আমরা দূর করে দেবো তাদের অন্তরের সব ঈর্ষা; তাদের নিচে দিয়ে বহমান থাকবে নদ-নদী-নহর; তারা বলবে- সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের এই জান্নাতের পথ দেখিয়েছেন; আল্লাহ আমাদের পথ না দেখালে আমরা কখনও পথ পেতাম না, আমাদের কাছে আমাদের প্রভুর রসুলরা সত্য নিয়ে এসেছিলেন; তখন তাদের ডেকে বলা হবে- তোমাদের আমলের (কৃতকর্মের) কারণেই তোমাদের জান্নাতের উত্তরাধিকারী হয়েছো। {৭–৪৩}
যারা ঈমান আনে ও আমলে সালেহ্ করে এবং তাদের প্রভুর প্রতি বিনীত হয়ে জীবন যাপন করে, তারাই হবে জান্নাতের অধিকারী, সেখানেই থাকবে তারা চিরকাল। {১১:২৩}
তাদের বলো- যারা ঈমান এনেছে, তারা যেনো ঐ লোকদের ক্ষমা করে দেয়, যারা আল্লাহর দিনগুলোর প্রত্যাশা করে না; এর কারণ, প্রত্যেক জাতিকে তার কর্মের প্রতিদান দেবেন আল্লাহ্ নিজেই। {৪৫:১৪}
মালাইকারা তাদের ওফাত ঘটায় পবিত্র জীবনযাপন করা অবস্থায়। তারা বলে- সালামুন আলাইকুম, আপনাদের প্রতি বর্ষিত হোক শান্তি, আপনারা দাখিল হোন জান্নাতে আপনাদের উত্তম আমলের বিনিময়ে। {১৬:৩২}
আর যে কেউ তাঁর কাছে উপস্থিত হবে মু’মিন হিসেবে আমলে সালেহ্ করে, তাদের জন্যে নির্ধারিত আছে উঁচু মর্যাদাসমূহ। চিরস্থায়ী জান্নাতে, যার নীচে দিয়ে উৎসারিত রয়েছে নদ-নদী; চিরকাল থাকবে তারা সেখানে; যারা আত্মোন্নয়ন- আত্মশুদ্ধি করে, এ পুরস্কার পাবে তারাই। {২০:৭৫,৭৬}
যারা তাদের প্রভুর অবাধ্য হওয়া থেকে আত্মরক্ষা করে জীবনযাপন করেছে, তাদের দলে দলে নিয়ে যাওয়া হবে জান্নাতের অভিমুখে; যখন তারা সেখানে পৌঁছাবে, খুলে দেবে জান্নাতের সব দরজা- সেখানকার ব্যবস্থাপকরা।
তারা বলবে- সব প্রশংসা আল্লাহর, তিনি আমাদেরকে দেওয়া ওয়াদা সত্য করেছেন এবং আমাদেরকে ওয়ারিশ বানিয়েছেন এই পৃথিবীর; এখন জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা আমরা আবাস বানাবো; পুণ্যকর্মীদের পুরস্কার কতোই না উত্তম! {৩৯:৭৩,৭৪}
নিশ্চয়ই যারা বলে– আল্লাহ আমাদের রব, তারপর এ–কথার উপর অটল–অবিচল থাকে, তাদের কোনও ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। তারা হবে জান্নাতের অধিবাসী, চিরদিন থাকবে তারা সেখানে, তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান হিসেবে। {৪৬:১৩,১৪}
এই সেই জান্নাত, যার ওয়ারিশ তোমাদের বানানো হয়েছে তোমাদের কর্মফল হিসেবে। {৪৩:৭২}
আর যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও ঈমানের পথে তাদের অনুগামী হয়েছে, আমরা তাদের সন্তানদেরকে তাদের সঙ্গে একত্র করে দেবো এবং তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান কিছুটাও হ্রাস করবো না; প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্যে দায়ী। {৫২:২১}
সেদিন আসবে প্রতিদান দিবস, যেদিন তাদের শাস্তি দেয়া হবে জাহান্নামে। তোমরা আস্বাদন করো তোমাদের শাস্তি। এই আযাবই তোমরা দ্রুত চেয়েছিলে। মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতে আর ঝরনা-ধারায়। তারা সেখানে উপভোগ করবে তাদের প্রভুর দেয়া নিয়ামতরাজি। কারণ ইতোপূর্বে তারা ছিলো কল্যাণপরায়ণ পুণ্যবান। {৫১:১৩-১৬}
হে কাফিররা! তোমরা আজ কোনো ওযর পেশ করো না; অবশ্যই আজ তোমাদের প্রতিফল দেওয়া হবে- তোমাদের কাজ অনুযায়ী। {৬৬:৭}
সেটি ছিলো একটি উম্মাহ, তারা অতীত হয়ে গেছে; তারা যা উপার্জন করেছে তার প্রতিফলই তারা পাবে; আর তোমরা পাবে তোমাদের উপার্জন- এর প্রতিফল। তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না- তাদের আমল সম্পর্কে। {২:১৩৪, ১৪১}
তোমরা সেই দিনটিকে ভয় করো, যেদিন তোমাদের আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে আনা হবে এবং প্রত্যেককেই তার উপার্জনের (কৃতকর্মের) প্রতিদান পুরোপুরি প্রদান করা হবে এবং তাদের প্রতি করা হবে না কোনো প্রকার অবিচার! {২:২৮১}
সেদিন তাদের কী অবস্থা হবে, যে সন্দেহাতীত দিনে আমরা তাদের জমা করবো এবং সবাইকেই তার উপার্জিত কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনো প্রকার যুলুম (অবিচার) করা হবেনা? {৩:২৫}
এভাবেই আমরা যালিমদের একদলকে আরেকদলের ওলি বানিয়ে দেই তাদের কৃতকর্মের কারণে। {৬:১২৯}
তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তন হবে তাঁরই কাছে; আল্লাহর ওয়াদা সত্য; তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন এবং তিনিই আবার সৃষ্টি করবেন, যারা ঈমান এনেছে ও আমলে সালেহ্ করেছে– তাদেরকে ইনসাফের সঙ্গে তাদের কর্মফল দেওয়ার জন্যে। আর যারা কুফুরি করে, তাদের জন্যে রয়েছে প্রচণ্ড গরম পানি শরবত আর বেদনাদায়ক আযাব- তাদের কুফুরির কারণে। {১০:৪}
সবর অবলম্বন করো- অবশ্যই আল্লাহ্ বিনষ্ট করেন না পূণ্যবানদের কর্মফল। {১১:১১৫}
…..যারা তাকওয়া আর সবর অবলম্বন করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সেইসব মুহসিনদের কর্মফল বৃথা যেতে দেন না। {১২:৯০}
এটা এ জন্যে হবে, যাতে করে আল্লাহ্ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মফল দিয়ে দেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। {১৪:৫১}
তবে যারা ঈমান আনবে ও আমলে সালেহ্ করবে, উত্তম আমলকারীদের কর্মফল আমরা কখনও বিনষ্ট করিনা! {১৮:৩০}
তারা তো শুধু এ জন্যেই অপেক্ষা করছে যেনো তাদের কাছে মালাইকা আসে, অথবা স্বয়ং তোমার প্রভু আসেন, অথবা তোমার প্রভুর কোনো নিদর্শন আসে। শুনো, যেদিন তোমার প্রভুর নিদর্শন আসবে সেদিন ঐ ব্যক্তি ঈমান আনলে তাতে তার কোনো ফায়দা হবেনা, যে ব্যক্তি আগে ঈমান আনেনি; কিংবা যে ব্যক্তি ঈমানের ভিত্তিতে কল্যাণ অর্জন করেনি; বলো- তোমরা অপেক্ষা করো। আমরাও অপেক্ষায় থাকলাম। {৬:১৫৮}
আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্মের প্রতিদান দেওয়া হবে; আজ কারো প্রতি কোনো প্রকার যুলুম (অন্যায়) করা হবে না; আল্লাহ্ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। {৪০:১৭}
দুষ্কৃতকারীরা কি ধরে নিয়েছে যে, আমরা জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে তাদেরকে ঐসব লোকদের সমতুল্য গণ্য করবো, যারা ঈমান আনে এবং আমলে সালেহ করে? তাদের সিদ্ধান্ত খুবই খারাপ।
আল্লাহ্ই সৃষ্টি করেছেন মহাকাশ ও যমিন সত্য ও বাস্তবতার সাথে এবং যাতে করে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্ম অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া যায়; কোনো প্রকার যুলুম করা হবেনা তাদের প্রতি। {৪৫:২১,২২}
তোমাদের মধ্যে যে এগিয়ে আসতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়তে চায় তার জন্যে। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের অর্জনের কাছে আবদ্ধ। {৭৪:৩৭,৩৮}
৬.
এ অবস্থায় মানবজাতির বিশ্বাসীদের দলকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। স্বয়ং মহাজগতের প্রভু আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করেছেন। কারণ, এতসব ভবিষ্যৎবাণী জানানোর পরও মানুষ প্রকারান্তরে নিজের মনের ইচ্ছার অনুসরণ করে। সামাজিক নানা রকম ভুল ও অপমানজনক চিন্তাধারার অনুসরণ করে। এর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর আয়াত অস্বীকারকারী বা ‘কুফরির’ গুনাহে জড়িয়ে যায়। যার পরিণতি নিশ্চিতভাবে বিপর্যয়। তিনি বলেছেন-
ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় যালিম আর কে, যাকে তার প্রভুর আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয়ার পরও সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সে তার কৃতকর্ম ভুলে যায়! আমরা তাদের অন্তরের উপর আবরণ সৃষ্টি করে দিয়েছি যেনো তারা তা বুঝতে না-পারে আর তাদের কর্ণে বধিরতা এঁটে দিয়েছি; ফলে তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে ডাকলেও তারা কখনও হিদায়াতের পথে আসে না।
তোমার প্রভু পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়; তিনি তাদের কৃতকর্মের জন্যে যদি তাদের পাকড়াও করতে চাইতেন, তবে অবশ্যই তাদের শাস্তি দানের বিষয়টি দ্রুত করতেন; বরং তাদের জন্যে রয়েছে একটি প্রতিশ্রুত সময়- যা থেকে বাঁচার জন্যে তারা কিছুতেই কোনো আশ্রয় খুঁজে পাবে না। {১৮:৫৭,৫৮}
আল্লাহ্ যদি মানুষকে কৃতকর্মের জন্যে পাকড়াও করতেন, জমিনের বুকে কোনো জীবজন্তুকেই রেহাই দিতেন না; তবে তিনি একটি নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাদের অবকাশ দেন; কিন্তু যখনই তাদের নির্ধারিত সময় আসবে, আল্লাহ অবশ্যই বান্দাদের প্রতি দৃষ্টি রাখবেন। {৩৫:৪৫}
….আবার যখন তাদের কৃতকর্মের ফলে তাদের উপর দুঃখ-দুর্দশা চেপে বসে, তখন মানুষ হয়ে পড়ে চরম অকৃতজ্ঞ। {৪২:৪৮}
৭.
এসব অসংখ্য আয়াতের সারমর্ম হলো- মানবজাতি তার চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর দেওয়া ‘স্বাধীনতার সুযোগ’ লাভ করে। পৃথিবীতে মানুষের সাফল্য বা ব্যর্থতা নানা ফ্যাক্টরের সঙ্গে জড়িত- কিন্তু তা আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন নি। যেসব মানুষ সময়-সুযোগ অনুযায়ী যুক্তি-বুদ্ধি-বিবেক-যোগ্যতা-মেধা কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করে তারা সেই কাজেরই ফলাফল পায়। কোনও না কোনও কারণে সে ফলাফল খারাপ হলেও মহাজগতের প্রভু সে খারাপ ফল নির্ধারণ করে দেন নি। বরং, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী- আরও খারাপ হওয়া বা আরও বেশি ক্ষতি হওয়া থেকে তিনি মানুষকে রক্ষা করেন। তিনি মানুষকে সঠিক কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ বা সুযোগ দেন। এই সুযোগ যে কাজে লাগায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য ভালোভাবে কাজ করে- দিনশেষে সেই সফল হয় ও হবে। দেশ-কাল-ধর্ম-বর্ণ-ভেদে সব মানুষের জন্য একই নীতি প্রযোজ্য। এই সাধারণ নীতির ফলাফলই আমরা দেখতে পাই জগৎজুড়ে।
কিতাবে বলা হয়েছে-
তবে, উপকার লাভ করবে সে, যে হাজির হবে শুদ্ধ-শান্ত কলব নিয়ে। সেদিন মুত্তাকিদের কাছেই নিয়ে আসা হবে জান্নাত। আর বিভ্রান্তদের জন্য খুলে দেওয়া হবে জাহান্নাম। {২৬:৮৯-৯১}
যেদিন এই যমিনগুলো পরিবর্তিত হয়ে যাবে অন্য এক পৃথিবীতে এবং মহাকাশও, তখন সব মানুষ হাজির হবে আল্লাহর সামনে, যিনি একক ও মহাপরাক্রমশালী। সেদিন তুমি অপরাধীদের দেখবে শৃঙ্খলিত! তাদের জামা হবে আলকাতরার, আর তাদের চেহারা আচ্ছন্ন করবে আগুন। এটা এ জন্যে হবে, যাতে করে আল্লাহ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মফল দিয়ে দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। এটি মানুষের জন্যে একটি বার্তা, যাতে করে এটি দিয়ে মানুষকে সতর্ক করা যায় এবং মানুষ জানতে পারে যে, নিশ্চয়ই তিনি একমাত্র ইলাহ; আর যেনো বোধবুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে। {১৪:৪৮-৫২}
এমতাবস্থায় তুমি সরাসরি কেবল আল্লাহর দীনের দিকেই মানুষকে আহ্বান করো এবং এর উপরই অটল অবিচল থাকো, যেভাবে তোমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। লোকেরা যা চায়, তা মেনে চোলো না; বরং তাদের বলো- আমি তো আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি ঈমান এনেছি; তা ছাড়া তোমাদের মাঝে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমাকে; আল্লাহই আমাদের প্রভু এবং তোমাদেরও প্রভু; আমাদের কর্ম আমাদের জন্যে আর তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্যে। আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোনো বিতর্ক নেই। একদিন আল্লাহ আমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন আর শেষ পর্যন্ত সবাইকে ফিরে যেতে হবে তাঁরই কাছে। {৪২:১৫}
মহান আল্লাহ যা বলেছেন- সত্য বলেছেন।
বি.দ্র.:
মহাগ্রন্থ আল-কুর’আনের আয়াত অনুবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা-অনুবাদ ব্যবহার করা হয়েছে।
Alhamdulillah, a very insightful discussion. Jazakallah Khaira..
আপনাদের কুরআনের অনুবাদ কোনটি সেটা কি কোনো পিডিএফ আকারে বা বই আকারে পাওয়া যাবে
আল-কুর’আনের বাংলা অনুবাদের কাজ চলছে। সময়সাপেক্ষ কাজ। তাই ক’বছর সময় লাগবে বৈকী!
কুর’আন অনুবাদের কাজ চলছে, ধন্যবাদ।
আপনাদের ফেসবুক পেইজ লিংক টা কি দেয়া যাবে
এই ওয়েবসাইটের পাশাপাশি আরও একটি ওয়েবসাইট তৈরির কাজ চলছে। শেষ হওয়ার আগেই ফেসবুক পেইজ তৈরি হবে। এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ফেসবুক পেইজ মেইনটেইন করছি না। সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ।
https://qrcbd.org/