ইজমা: শিরকের চোরাবালি

ইজমা: শিরকের চোরাবালি

১.
আহলে কিতাব বা কিতাবধারীদের একটি অংশ হলো খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা। তাদের একটি জনপ্রিয় মতবাদ হলো ট্রিনিটি মতবাদ। ট্রিনিটি বা ত্রিত্ব’ মতবাদে বলা হয়েছে- তিনটি একক অস্তিত্ব। বেশিরভাগ খ্রিষ্টান মানুষ এই ধারণা বিশ্বাস করে; তবে সবাই নয়।

প্রশ্ন হলো- এই মতবাদ শিরক’ নাকি ‘কুফর’?, স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন-  

  • ওরাও কুফুরি করেছে যারা বলে- আল্লাহ হলেন তিনজনের একজন। {৫:৭৩}

অর্থাৎ- এই ধারণার জন্মদাতারা হলো কাফির; কারণ তারা কুফর করেছে বা ‘আল্লাহর একক সত্তাকে’ অস্বীকার করেছে। যে বা যারা এই ট্রিনিটি মতবাদ তৈরি করেছে- তারা সুস্পষ্টভাবে কাফির। কিন্তু, যারা এতে বিশ্বাস করলো- সে কি সমান অপরাধী? নিশ্চয়ই না।
কারণ, তৈরি করা/শুরু করা এবং তাতে বিশ্বাস করা সম পর্যায়ভুক্ত বিষয় না।

বৃহত্তর মুসলিম সমাজেও একই ধরনের বিষয় আছে। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা ট্রিনিটির চেয়েও ভয়াবহ। জনৈক কুর’আন বিশেষজ্ঞ একে বলেছেন- কোয়াড্রেনিটি (Quadranti)  বা চার খোদার অস্তিত্ব। এটি উসুলে ফেকাহর হাত ধরে জন্ম নিয়েছে।
এটি আল্লাহর দীন ইসলামের ভয়াবহ বিরুদ্ধাচরণ। এই ধারণা থেকে আমাদের মাঝে ৪টি হুকুমদাতা (স্রষ্টা) জন্ম নিয়েছে!

২.
যখন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল হয়, তখন বিশ্বে সুনামির মতো ধাক্কা লাগে। বিশ্বে ছিল ভয়াবহ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। যুদ্ধাবস্থা, দাসত্ব, নারী-শিশু-বয়স্ক নির্যাতন, আর্থিক ভারসাম্যহীনতা, আধিপত্য, আগ্রাসন, আস্থাহীনতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে টালমাটাল এই বিশ্বব্যবস্থা নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত ছিল।  

এমতাবস্থায় মহাজগতের প্রভু কুরআন নাযিল করে গোটা মানবজাতিকে পথের দিশা দেন। সঙ্গত কারণেই তৎকালীন আধিপত্যবাদী মহল এই কুরআনকে মেনে নিতে পারেনি। নতুন সেই দর্শন, মত ও পথকে মেনে নেওয়া সুবিধাভোগীদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না।

তখন তারা এর বিরোধিতায় নানা রকম পদক্ষেপ নিতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামের প্রচণ্ড শক্তি মানুষকে আকর্ষণ করে। বড় বড় তাগুত (বিরোধী শক্তিকে) পরাস্ত করে চতুর্দিকে সত্যের বাণী ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে মানুষ আকৃষ্ট হতে থাকে মহৎ উদার-নৈতিক এই জীবনব্যবস্থার প্রতি। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারী বসে ছিল না। তারাও নানা ফন্দি-ফিকির করতে থাকে।

ইসলামের বিরুদ্ধে কোনও শক্তি দাঁড় করাতে না পেরে দুষ্কৃতীকারীরা ইসলামি বিশ্বাসের মধ্যেই বিষ ঢেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে।

তারা এমন একটা পথ তৈরি করে- যা দেখতে ইসলামের মতোই, যা চলবে ইসলামের পাশাপাশি; সময় সুযোগ করে ঢুকে যাবে ইসলামের ভেতরে। এটা এমনই এক অস্ত্র- যা সমান্তরাল পথে চলবে বন্ধুর মতো; পরে ভাইরাসের মতো জেঁকে বসবে। তা ইসলাম নয়কিন্তু মানুষ তাকে ইসলাম মনে করে গ্রহণ করবে। ষড়যন্ত্রকারীরা ফের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

মনে রাখতে হবে যেএই জগতে মানুষকে নিয়ন্ত্রণই হলো আধিপত্যবাদীদের মূল লক্ষ্য।

যার বিপরীতে ইসলাম হলো একটি অবাধ-স্বাধীন জীবনব্যবস্থার নাম। মানুষের এই স্বাধীনতাকে আগ্রাসী শক্তিরা মেনে নিতে পারেনি।

৩.
কখন থেকে এটা শুরু হলো?

খোদ কুরাইশদেরই একটা অংশ- উমাইয়্যা রাজবংশের (৬৬১ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) হাত ধরেই এর উদ্ভব হয়। যারা অপেক্ষা করছিল পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আসার জন্য। রসুলের মৃত্যুর ৩০/৪০ বছরের মধ্যেই তারা সে সুযোগ পেয়ে যায়। উমাইয়্যা শাসক- মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদের আমলে এমন নানা বিষয় সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে।

মানুষকে নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হলো মানুষের মন ও অন্তঃকরণের ওপর হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ করা। ইতিহাস বলে- উমাইয়্যা রাজবংশের প্রথম শাসক মুয়াবিয়ার আমলেই জাল হাদিস তৈরি করা হয়। শিরক
তৈরির পথ খোলা হয় খোদ নবী মোহাম্মাদের নাম দিয়েই। বিরাট মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কুর
আন থেকে সরানোর জন্য নিজেদের মধ্যে নতুন ধরনের ধর্মীয় নেতৃত্ব তৈরি করা হয়, যারা সত্যের সঙ্গে মিথ্যা ও কল্পনা মিশ্রিত করে নতুন একটি শাখার জন্ম দেয়। যে বিষবাস্পের ধারাবাহিকতা আজও চলমান।

ছবি: উমাইয়্যা রাজবংশের নিয়ন্ত্রিত এলাকা

আমরা জানি, কেউ যদি কুফর করে এবং কাফির অবস্থায় মারা যায়- তার গন্তব্য জাহান্নাম।

  • তোমাদের যে কেউ নিজের দ্বীন হতে ফিরে যায়, অতঃপর সেই ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মারা যায়, তবে এমন লোকের কর্ম দুনিয়াতে এবং আখেরাতে ব্যর্থ হয়ে যাবে। আর এরা অগ্নিবাসী, চিরকালই তাতে থাকবে। {২:২১৭}

কিন্তু, আল্লাহ বলেন নি যে- কুফরের গোনাহ কখনও ক্ষমা করা হবে না। বরং বলেছেন- শিরকের গোনাহ তিনি ক্ষমা করবেন না।

  • আল্লাহর সাথে শিরক করা হলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এ ছাড়া অন্য পাপসমূহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন। যে আল্লাহর সাথে শিরক করে, সে তো উদ্ভাবন করে এক মহা পাপ। {৪:৪৮}

কিন্তু কেন? শিরক ও কুফরে মৌলিক কী পার্থক্য আছে?

যেমন, কেউ যদি অস্বীকার করে যে- এই মহাবিশ্ব আল্লাহ সৃষ্টি করেন নি; তাতে মহাবিশ্বের ক্ষতি নেই। সে আল্লাহর অস্তিত্ব উপলব্ধি না করার দরুন (ইবাদতের স্বাধীনতার শক্তি দিয়ে) মহাবিশ্বের স্রষ্টাকে অবিশ্বাস করলো। এতে বিশ্বাসীদের ওপর কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে না। সাধারণ বিশ্বাসী মানুষ বরাবরের মতোই বিশ্বাসের ওপর জীবনযাপন করতে পারে।

কিন্তু যখন কেউ আল্লাহকে স্বীকার করার পর ভিন্ন এক বিধানদাতা স্রষ্টাকে টেনে আনল- তখনই শিরক হলোএবং তার আরোপিত বিধি-বিধান মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। সাধারণ মানুষ তখন আল্লাহর বিধানের পাশাপাশি তাদের বিধানকেও মানতে শুরু করে। এজন্যই বলা হয়েছে যে- শিরকের গোনাহ ক্ষমা করা হবে না।

কারণ, শিরক থেকে ভিন্ন বিধি-বিধান-হুকুম তৈরি হয়। অথচ, সৃষ্টি যার- হুকুম চলবে তার। আর মহোত্তম সৃষ্টি (আহসানুল খালক্) তো শুধুই আল্লাহর।

৪.

মানুষ মহান আল্লাহর সৃষ্টি। তিনি মানুষ তৈরি করেছেন, তাই মানুষকে শুধু তিনিই বিধি-বিধান দিতে পারেন।
একজন মানুষের জন্য অন্য মানুষ কি হুকুম বা বিধান দেওয়ার অধিকার রাখেএকজন মানুষ কি আরেকজন মানুষের হুকুম মানতে বাধ্য?
অবশ্যই না।

আর, এখানেই মূলত স্রষ্টার বিধানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ অবস্থায় স্রষ্টাকে (কুরআনকে) বাইপাস করার জন্য সুকৌশলে তিনটি বিষয় সামনে আনা হয়। তা হলো- মোহাম্মদ, ইজমা ও কিয়াস।
আমাদের জানা উচিত মোহাম্মদ রসুলুল্লাহ একজন মানুষ; যার ওপর ওহি নাযিল হতো। আর তিনি আমাদের কারও জন্য উকিল বা অভিভাবক নন।

  • আর মোহাম্মদ একজন রসুল ছাড়া কিছু নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসুল চলে গেছে….। {৩:১৪৪}

সব মিলিয়ে আল্লাহমোহাম্মদ, ইজমা ও কিয়াসএকসঙ্গে আমাদের সামনে হাজির করা হলো। 

এটাই হলো কুরআনের পাশাপাশি ইসলামি শরিয়ার আইনের নতুন উদ্ভাবিত ৩টি উৎস! এটিই উসুলে ফিকহের উৎস!!!

৫.
কখন থেকে এর সূত্রপাত?

৪০ হিজরির পর থেকেই ইজমা ও কিয়াসের বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর সামনে আনা হয়। এই সময়কালকে ইতিহাসে বলা হয়েছে ইসলামের স্বর্ণযুগ! ওই একই ইতিহাসে ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস করে উমাইয়্যা রাজবংশের গোড়াপত্তন হতে দেখা যায়।

এ সময় সাহাবীদের মধ্যে যুদ্ধ-সংঘর্ষ হয়। 
রসুল সা.-এর বংশধরদের হত্যা করে নিশ্চিহ্ন করা হয়। 
মক্কার কাবা শরীফের ওপর হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। (৬৪ হিজরি)
মদিনায় ঘরে ঘরে গিয়ে ইয়াজিদ সেনারা নারীদের শ্লীলতাহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
এটা যদি ইসলামের স্বর্ণযুগ হয়, তাহলে ইসলামের ধ্বংসযুগ কোন সময়কে বলা যেতে পারে?

মাত্র কয়েক দশক আগে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মুসলিম জাতির মন ও মননকে নিয়ন্ত্রণের জন্যই ইজমার ধারণা সামনে আনা হয়। যা আল্লাহর বিধানের পাশাপাশি নয়া বিধান দেওয়ার যোগ্যতা রাখে। মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ইজমার দোহাই দিয়ে নতুন নতুন হুকুম-আহকাম বেঁধে দেওয়া হলো কোনটা হারাম ও কোনটা হালাল- নতুন করে তা লিখে দেওয়া হলো। কী কী করা যাবে- আর কী কী করা যাবে না- তাও তৈরি করে দেওয়া হলো!

অর্থাৎ, মহাজগতের প্রভুর দেওয়া আল-কিতাব আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই, মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় মহল গজিয়ে উঠল এবং নানা বিষয়-ভিত্তিক ধর্মীয় কিতাবের ভীষণ প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো!

এসময় উদ্ভব হলো তাফসির সাহিত্য। পাড়ায় মহল্লায় কুরআন চর্চার বদলে তাফসির চর্চা ও আরবীয় গল্প-কাহিনীর বিস্তার ঘটতে লাগল। দেশ-কাল-যুগ-যুগান্তরে স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন গল্প-কাহিনী তৈরি হতে লাগল!

গান, বাদ্যযন্ত্র, রেশম-পশম, চুল-দাড়ি-ভুরু-উরু, লোম-গোঁফ-নখকাটা– কোনোকিছুই বাদ গেল না। নতুন সব বিধিবিধান সামনে আনা হলোযার সঙ্গে দীন ইসলামের আদৌ কোনও সম্পর্ক নাই!

এসব বিষয়কে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করার জন্য মিথ্যা হাদিস জন্ম দেওয়া হলো। সেসব হাদিসের জন্মদাতারা নিজেদের বিধান ব্যাখ্যাকারী সোল এজেন্ট হিসাবে ইজমার নাম দিয়ে ফতোয়া জারি করা শুরু করলেন। আর তার ভিত্তিতে উদ্ভূত হলো নানা রকম ফিকাহর বই।

৬.

অথচ, মানুষের জন্য বিধি-বিধান বা হুকুম দিয়েছেন শুধু আল্লাহ। পাশাপাশি, তিনি নবীর মাধ্যমে আমাদেরকে শিক্ষা দিলেন- শুধুমাত্র কুরআন অনুসরণ করতে হবে, শুধুমাত্র আল্লাহর হুকুমের গোলামি করতে হবে।

  • কোনো মানুষকে আল্লাহ কিতাব, হিকমাহ ও নবুয়্যত দেওয়ার পর সে মানুষকে বলবে না যে- তোমরা আল্লাহর বদলে আমার দাস হয়ে যাওবরং সে বলবে- তোমরা আল্লাহর দাস হও। কারণতোমরা তো কিতাব শিক্ষা দিতে এবং নিজেরাও অধ্যয়ন করতে। { ৩:৭৯ }

  • ৩:১৫৪ তাদের বলো- হুকুম দানের ক্ষমতা পুরোটাই আল্লাহর।
  •  ৬:৫৭ আল্লাহ ছাড়া কারও নির্দেশ চলে না। ইন্নিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ..।
  • ১২:৪০ إِنِ  الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ আল্লাহ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই।
  • ১২:৬৭ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّ   নির্দেশ আল্লাহরই চলে।
  • ২৮:৭০ وَلَهُ  الْحُكْمُ বিধান তাঁরই ক্ষমতাধীন।
  • ২৮:৮৮ لَهُ الْحُكْمُ বিধান তাঁরই…।
  • ৪০: ১২ لِلَّهِفَالْحُكْمُ  ফাল হুকুমু ইলাল্লাহ।
  • ৮৪:৫ এভাবে সে তার রবের হুকুম পালন করবে, তা করাই তার জন্যে হক।

দীন বা শরিয়তের  বিষয়ে মানুষ বা মানুষের মধ্যে যারা শাসন/বিচার কাজ পরিচালনা করবেন- তারা আল্লাহর হুকুম-সমূহের ভিত্তিতেই তা করবেন। মানুষের নিজের মনগড়া কোনো সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নয়। সেটাও নিশ্চিত করেছেন আল্লাহ।

  • আমরা তোমার প্রতি সত্যতা ও বাস্তবতার নিরিখে নাযিল করেছি এই কিতাবযাতে আল্লাহ তোমাকে যে সঠিক পথ জানিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মাঝে বিচার ফায়সালা করো। {৪:১০৫ }

  •  لِتَحۡكُمَ بَيۡنَٱ لنَّاسِ লিতাহকুম বাইনান্‌ নাস যাতে তুমি মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা করো। { ৪:১০৫ }

এটা খুবই সুস্পষ্ট- যে আল্লাহ ছাড়া কারো নির্দেশ চলে না। ইন্নিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ। {৬:৫৭}

এবং আল্লাহ কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরিক করেন না। {১৮:২৬}

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ কাউকে তাঁর হুকুম, বিধান, আইন-কানুন পরিবর্তন করার অধিকার দেন নি। যে কেউ তা করলে- সে শিরক করলো এবং এই শিরক হলো ক্ষমার অযোগ্য আচরণ।

আল্লাহর হুকুম স্থির ও সুনির্ধারিত। তা কখনও ওঠানামা (variable) করে না। আল্লাহর হুকুমের মধ্যে সুবিশাল সীমানাও নির্ধারিত করা আছে।

অন্যদিকে, ইজমার মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজনে হুকুম/ বিধানকে পরিবর্তন করা যায়। নতুন করে হালাল-হারামও ঘোষণা করা যায়!

যেমন- কিসাসের বিধান। হত্যাকাণ্ডের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডই শাস্তি। কিন্তু হত্যার শিকার পরিবারের সদস্যরা যদি অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়- কিসাসের বিধান অনুযায়ী- অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া যায়। এটাই আল্লাহর বিধান। হত্যাকারীর শাস্তির সীমানা ক্ষমা থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত’ বিস্তৃত।

কিন্তু, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় আইনে তা সম্ভব না। হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে- মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র সমাধান। এমনকি হত্যাকাণ্ড না করেও মিথ্যা প্রমাণের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়!

কুরআনে রেশমের পোশাক পরা, মদ পান, যিনা এসবকে হারাম’ বলা হয় নি। কিন্তু ইজমার প্রশাসকরা এসবকে হারাম বিধান/হুকুম দিয়ে রেখেছেন।

৭.
প্রশ্ন হতে পারে- ইজমার শুরু হলো কীভাবে?

ইজমা ধাপে ধাপে আমাদের চিন্তা-চেতনা-সংস্কৃতিতে পদ্ধতিগতভাবে প্রবেশ করানো হয়েছে। এটি  শুরু হয়েছে নবী মোহাম্মদকে দিয়ে। 

শেষ নবীকে জগতের সব নবী ও রসুলদের মধ্যে শীর্ষনেতা’ বানানো হয়েছে।

তারপর, নবী মোহাম্মদের অনুসারীদের সব জাতি ও মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি/উম্মত/সম্প্রদায় বানানো হয়েছে।

এবার শ্রেষ্ঠতমদের মধ্যে নিজেদের দলকে আল্লাহর চেইন অফ কমান্ডের উত্তরাধিকারী বানিয়ে বিধি-বিধান, হুকুম-আহকাম বানিয়ে জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এসব ভ্রান্ত ও মনগড়া নিয়ম-কানুন ও চিন্তা-ধারার উপর ভিত্তি করে যুগে যুগে রচিত হয়েছে সাহিত্য, দর্শন; গড়ে উঠেছে কত শত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দল-মত-ফিরকা!

এমনকি, এসব লোকজন নিজেদের ভুল ও অনৈতিক সিদ্ধান্তকেও প্রভুর সওয়াব লাভের উপায় হিসেবে দাবি করেছে।যেমন- ইজতিহাদ করে কোনো অপকর্ম করলেও আল্লাহ পুরস্কার দেবেন- এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে।

এখন আমাদের সামনে দীন ইসলামের দুটি শরিয়া উপস্থিত। একটি মহাজগতের প্রভু- আল্লাহর শরিয়া (কুরআন/আল-কিতাব) এবং মানুষের তৈরি ধর্মীয় শরিয়া (উসুলে ফেকাহ্)।

অবশ্যই মানুষ নিজেদের বিধি-বিধান তৈরি করতে পারে। যেমন- কোন গ্রামে কয়টা রাস্তা হবে, লাল-নীল ট্রাফিক বাতি থাকবে কিনা- সেই নিয়ম অবশ্যই মানুষ বানাতে পারে। এর সঙ্গে দীন ইসলাম বা ইসলামি ব্যবস্থার সংঘাত নেই।

কিন্তু আল্লাহর হুকুম-আহকামের পাশাপাশি যখন নবী মোহাম্মদ রসুলুল্লাহর নামে হাদিস ও সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস নিয়ে আসা হলো- তা কিন্তু গ্রামের পথঘাট তৈরির নিয়ম দেয় না। বরং এসব বিষয় মানুষের চিন্তা-চেতনা ও মৌলিক স্বাধীনতাকে হরণ করে এবং আল্লাহর হুকুম ও বিধানে হস্তক্ষেপ করে।

৮.
প্রশ্ন হতে পারে, কে এই ইজমার স্রষ্টা?

তিনি ইমাম শাফি (৭৬৭-৮২০ সাল)। তিনিই হলেন আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত-এর ফাউন্ডার ফাদার (Godfather)

[আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইদ্রিস আল-শাফিঈ (আরবি:أبـو عـبـد الله مـحـمـد ابـن إدريـس الـشـافـعيّ‎‎) একজন ফিলিস্তিন-আরব মুসলমান তাত্ত্বিক, লেখক ও পণ্ডিত। তিনি ইসলামের অন্যতম সেরা আইনবিদ হিসাবে পরিচিত। তাকে শায়েখ আল-ইসলাম হিসাবেও সম্বোধন করা হয়। তিনি শাফিঈ মাযহাবের প্রবক্তা। তিনি ছিলেন ইমাম মালিক ইবনে আনাসের অন্যতম সেরা শিক্ষার্থী এবং তিনি নাজারাহ-এর গভর্নর। উইকিপিডিয়া]

দ্বিতীয় গুরু হলেন ইবনে তাইমিয়া।

[তকীউদ্দীন আহমদ ইবনে আব্দুল হালিম ইবনে আব্দুস সালাম আন-নুমায়রী আল হাররানী (আরবি: تقي الدين أحمد بن عبد الحليم بن عبد السلام النميري الحراني ‎‎; ১২৬৩১৩২৮), যিনি ইবনে তাইমিয়া (ابن تيمية) নামে বেশি পরিচিত। তিনি সুন্নি ইসলামি পণ্ডিত, মুহাদ্দিস, ধর্মতাত্ত্বিক, বিচারক, আইনজ্ঞ, তর্কসাপেক্ষে দার্শনিক, বিতর্কিত চিন্তক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। উইকিপিডিয়া]

উসুল আল ফিকাহর (أصول الفقه‎‎)এর দাবি অনুযায়ী, ইসলামি আইন হুকুম আহকামের চারটি সূত্র রয়েছে। কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস।

ইজমা (إجماع)  এর আভিধানিক অর্থ- কোনও বিষয়ে সব ‍জনগণের একমত হওয়া।

আবু হানিফা বলেছেন, ইসলামি শরিয়াতের কোনও হুকুমের ব্যাপারে একই যুগের সব মুজতাহিদদের একমত হওয়াই ইজমা।

অর্থাৎ, ইসলামি হুকুম আহকামকে গণতান্ত্রিক রূপ দেওয়া হলো। বাস্তবতা হলো- লোকে বলে, আজ  পর্যন্ত কোনও যুগের সব আলেম-ওলামাগণ কোনও একটি বিষয়েও একমত হতে পারে নি!

শুধু তা-ই নয়, ইজমা কাকে বলে? এর সংজ্ঞা কী? এই উত্তরের ব্যাপারেও তারা একমত হতে পারেন নি!
বিস্ময়কর নয় কী!

এমনকি শাফিঈ যখন ইজমা ও কিয়াসের ধারণা দেন- তখনও মুসলিম বিশ্বের একটি চিন্তাশীল গ্রুপ (মুতাজিলা) এর বিরোধিতা করেছিল। যদিও তৎকালীন ক্ষমতাশীলদের দাপটে মুতাজিলারা খুব একটা প্রতিরোধ গড়তে পারে নি। কারণ ইজমা ও কিয়াস দিয়ে খোদায়ী বিধানকে দূরে ঠেলে দেওয়া, মানুষের মত প্রকাশ ও বাক স্বাধীনতা হরণ করে, শাসকবর্গের চিন্তা-চেতনা জনগণের ওপর চাপানো, জনগণকে নিয়ন্ত্রণের মহাসুযোগ খিলাফত ধ্বংসকারী রাজবংশগুলো হাতছাড়া করতে চায় নি।

[মুতাজিলা (المعتزلة‎‎) হল ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি শাখা। এ দলটি যুক্তি ও কারণের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ৮ম থেকে ১০ শতাব্দীতে বসরা ও বাগদাদে এর প্রাধান্য ছিল। উমাইয়া যুগে মুতাজিলা আন্দোলন শুরু হয়। ওয়াসিল ইবনে আতাকে মুতাজিলা মতবাদের জনক হিসেবে ধরা হয়। উইকিপিডিয়া]

৯.

এখন আমরা কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে কথা বলব। যে আয়াতকে ইজমা ধারণার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।

  • ওহে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, আনুগত্য করো এই রসুলের, আর তোমাদের মধ্যে সেইসব লোকদের যারা দায়িত্বশীল ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত। আর তোমরা যখনই কোনো বিষয়ে মতভেদ ও মতবিরোধ করবে, তা উপস্থাপন করো আল্লাহ ও রসুলের কাছেযদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখো। এটিই কল্যাণকর পন্থা এবং পরিণতির দিক থেকেও সর্বোত্তম। {৪:৫৯}

এখানে প্রথমত আহ্বান করা হচ্ছে- আল্লাহর রসুল যাদের মাঝে উপস্থিত সেই সব লোকদেরকে। বিতর্কিত বিষয় মীমাংসার জন্য তারা আল্লাহ ও রসুলের কাছে যাবে।

রসুল কী কুরআনের বাইরে কোনও কিছু দিয়ে তাদের মধ্যে মীমাংসা করবেন?
অবশ্যই না। তার কারণ কি?

কারণ, একই সুরায় রসুলকে বলা হয়েছে- আমরা তোমার প্রতি সত্যতা ও বাস্তবতার নিরিখে নাযিল করেছি এই কিতাবযাতে আল্লাহ তোমাকে যে সঠিক পথ জানিয়েছেন- সে অনুযায়ী মানুষের মাঝে বিচার ফায়সালা করো। {৪:১০৫}

শুধু তা-ই নয়;  তোমরা যে ব্যাপারেই মতভেদ করো না কেন, তার ফায়সালা দেওয়ার মালিক তো একমাত্র আল্লাহ।  এই আল্লাহই আমার রব। তাঁর উপরই আমি আস্থা স্থাপন করেছি এবং আমি শুধু তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি। {৪২:১০}

অর্থাৎ সুস্পষ্টভাবে রসুলকেও কুরআনের বিধান দিয়েই বিচার-ফয়সালা করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ। এর বাইরে যাওয়ার কোনও সুযোগ রসুলের নেই বা ছিল না।

এরপর রইলো সেইসব নেতৃবৃন্দ যারা পরবর্তীতে মানুষের মাঝে দায়িত্বশীল। এসব দায়িত্বশীল অবশ্যই বৈধ বা জনগণের বৈধ নেতৃত্ব বিবেচনা করা হয়েছে।

আমাদের বিভিন্ন দেশের মুসলিম ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা কি জনগণের বৈধ নেতা? তারা কি কোনও ধরনের নির্বাচন বা জন-মতামতের ভিত্তিতে সামাজের ধর্মীয় কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব পেয়েছেন? কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদ্রাসার সনদ দিয়ে আলেম/মুহাদ্দিস/মুফাস্‌সির হওয়া যায় এতে কি তারা সামাজিক নেতৃত্বের মর্যাদা পান?

কখনোই না!

এমতাবস্থায় তারা কীভাবে হুকুম/বিচার/ফয়সালা করতে পারেন বা রায় দিতে পারেন! তাদের সেই অধিকার কেউ দেয়নি। তারপরও সেসব তথাকথিত ধর্মীয় নেতারা মানুষের জন্য নিজেদের মনগড়া বিধান দেন- যার কোনও বৈধতা নেই। 
বরং, বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত সরকার জনগণের জীবন-যাপনের উপযোগী বিধি-বিধান তৈরি করেন; যা সম্পূর্ণ বৈধ এবং তা সাধারণত খোদায়ী বিধানের/ইসলামি শরিয়ার সঙ্গে তুলনা বা বিরোধিতা (contradict) করে না।

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ইসলামি ব্যক্তিত্ব ড. ইউসুফ আল কারযাভী। যিনি মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী গবেষক। তাঁর একটি বই হলো- ইসলামে হালাল হারামের বিধান। এই বইতে শত শত বিষয় হালাল ও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুন্নি ইসলামি বিশেষজ্ঞরা তা মেনেও নিয়েছেন। বইটির লেখক ইমাম শাফিঈ, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়্যুম এর ধারাবাহিকতায় নিজেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে হুকুমদাতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

যেখানে স্বয়ং নবী মোহাম্মদ নিজেকে হুকুমদাতা বলেন নি; বরং হুকুমদাতা শুধুই এক আল্লাহ।

  • …(হে নবী!) তাদের বলো: হুকুম দানের ক্ষমতা পুরোটাই আল্লাহর। {৩:১৫৪}
  • ….নিশ্চয়ই আল্লাহ হুকুম প্রদান করেন যা তিনি চান। {৫:১}
তাই দীনের ক্ষেত্রে, শরিয়তের ক্ষেত্রে প্রভুর হুকুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে নতুন হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধান তৈরি করা ও মানুষের মাঝে প্রয়োগ করা বা চাপিয়ে দেওয়া সুস্পষ্ট শিরক। সেটা ইজমা বা যে নামেই হোক না কেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *