মিল্লাতে ইবরাহিম

মিল্লাতে ইবরাহিম কী ও কেন

সময় এসেছে নতুন করে মহান রব্বুল আলামিনের নবী ও রসুল ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর জীবনাদর্শ অনুধাবন করার।

কারণ, মহাগ্রন্থে রব্বুল আলামিন তাঁকে বিশ্ববাসীর নেতা ও মুসলিমদের নেতা ঘোষণা করেছেন। শেষ নবী মোহাম্মদ রাসুলাল্লাহকে ইবরাহিমের আদর্শের অনুগামী হতে বলেছেন এবং মানুষের সামনে তাঁর কথা ঘোষণা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইবরাহিম আ.এর বংশধরদের মধ্য থেকেই এসেছেন শেষ পয়গম্বর নবী মোহাম্মদ সা.।

যে কেউ আল্লাহর অসংখ্য নবী ও রসুলগণের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে পার্থক্য তৈরি করবে- সে মূলত ইসলামিক পরিমণ্ডল থেকে ছিটকে পড়বে। এমন পার্থক্যকারীকে আল্লাহ কাফিরুনা হাক্ব বা প্রকৃত অস্বীকারকারী বলেছেন।

তিনি বলেন-
নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলদের অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলদের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় এবং বলে- আমরা কয়েকজনকে মানি, আর অন্যদের মানি নাআর তারা এ দুয়ের মধ্যে একটি পথ বানাতে চায়; তারাই আসল কাফির। আর আমরা কাফিরদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছি অপমানজনক শাস্তি। 
আর যারা ঈমান আনে আল্লাহর প্রতি, তাঁর রসুলদের প্রতি এবং তাদের কারো মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না, অচিরেই তাদের তিনি দেবেন তাদের প্রাপ্য পুরস্কারএবং আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়াময়। {৪:১৫০,১৫১}

এ অবস্থায় মহান আল্লাহর সব রসুলদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে। পাশাপাশি, কুরআনে যেসব রসুলদের জীবনাদর্শ বর্ণনা করা হয়েছে- তাঁদের থেকে শিক্ষা নিতে হবে। 
 

দেখা যায়, কুরআনে আহযাব যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতি বর্ণনার সময় মোহাম্মদুর রসুলাল্লাহর অনুসারীদের উৎসাহ দিয়ে বিশ্বাসী যোদ্ধাদের আল্লাহ বলছিলেন- নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রসুলের মধ্যে উত্তম উদাহরণ (হাসনাতুন) আছে- যে আশা করে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। মুমিনরা যখন সম্মিলিত বাহিনী দেখেছিল….. {৩৩:২১,২২} 

অন্যদিকে ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে আমাদের জন্য উত্তম নানা উদাহরণ (আদর্শ) আছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ।

তোমাদের জন্যে রয়েছে একটি উত্তম উদাহরণ/ আদর্শ ইবরাহিম ও তার সঙ্গীদের মধ্যে। {৬০:৪}

পাশাপাশি, হজরত ইবরাহিম সম্পর্কে কুরআনে বার বার বলা হয়েছে- তিনি একনিষ্ঠ ছিলেন বা হানিফা- এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না। অর্থাৎ, দীনের প্রতি হানিফা (একনিষ্ঠ/ নিষ্ঠা) হলো- মুশরিকের বিপরীত অবস্থা। মুশরিক কি? যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে আবার শিরকও করে- সেই মুশরিক।

অধিকাংশ মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করে, কিন্তু পাশাপাশি শিরকও করে। {১২: ১০৬}

বল, আমাকে আমার রব সিরাতল মুস্তাকিমে পরিচালিত করেছেন- সুপ্রতিষ্ঠিত দীন, একনিষ্ঠ ইবরাহিমের আদর্শ (দীনান ক্বিয়ামাম মিল্লাতা ইবরহিমা হানিফা); সে মুশরিক ছিল না। {৬:১৬১}

তাই শেষ নবী মোহাম্মাদ রসুলাল্লাহ এবং নবী ইবরাহিম রসুলাল্লাহর মধ্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় কোনও পার্থক্য থাকলে কুরআনের দৃষ্টিতে অপরাধী (কাফির) হবার বিরাট ঝুঁকি থেকে যায়। যেখানে শেষ নবী মোহাম্মদ রসুলাল্লাহকে বলা হচ্ছে ইবরাহিমের মিল্লাত অনুসরণ করার জন্য- সেখানে আপনার ও আমার জন্য করণীয় সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার। 

তাই সর্বাগ্রে কয়েক হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া ইবরাহিম রসুলাল্লাহ সম্পর্কে জানতেই হবে। কীভাবে জানা যাবে- যদি মহান আল্লাহ সেই দূর অতীতের কথা না বলেন?

বরাবরের মতো আবারও পবিত্র মহাগ্রন্থেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক- মোহাম্মাদ রসুলাল্লাহ তাঁর শ্রদ্ধেয় পূর্বপুরুষ- আল্লাহর প্রিয় রসুল ইব্রাহিমের কী কী কথা কথা জনগণের মাঝে ঘোষণা করেছিলেন।

মহান আল্লাহ নবী করীম সা.কে ইবরাহিমের আ.এর খবর জনসমাজে প্রচার করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি মোহাম্মদ রসুলাল্লাহকে ইবরাহিমের রসুলাল্লাহর অনুসরণ করতেও নির্দেশ দিয়েছেন:

এই কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী ইবরাহিমের কথা আলোচনা করো। সে ছিলো একজন সিদ্দিক নবী। {১৯:৪১}

এবং আবারও- তাদের কাছে ইবরাহিমের সংবাদ পাঠ করো। {২৬:৬৯}

কারণ, ইবরাহিম ছিলো একটি জাতির মতো- আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ (হানিফা) এবং সে মুশরিক ছিল না; আর  আমরা তাকে দুনিয়াতে দিয়েছিলাম কল্যাণ; পরকালেও সে হবে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।

তারপর আমরা তোমাকে ওহি করছি- তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহিমের মিল্লাতের অনুসরণ করো; এবং সে নিশ্চয়ই মুশরিক ছিল না। {১৬:১২০-১২৩}

আমাদের সবার জ্ঞাতার্থে আল্লাহ-রব্বুল আলামিন বলছেন:

জেনে রাখো, মানবজাতির মধ্যে ইবরাহিমের কাছের লোক হলো তারা, যারা তার অনুসরণ করেছে এবং এই নবী (মোহাম্মদ); আর যারা বিশ্বাসী; আল্লাহই মুমিনদের অভিভাবক। {৩:৬৮}

তোমরা বলো- আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি। তা ছাড়া আমরা ঈমান রাখি তার প্রতি, যা নাযিল হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা নাযিল হয়েছিল ইবরাহিম, ইসমাঈলইসহাক এবং ইয়াকুব ও তার সন্তানদের প্রতি; আর যা নাযিল হয়েছিল মুসা ও ঈসার প্রতি; আর যা দেওয়া হয়েছিল অন্যান্য নবীদের তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে। আমরা তাদের কারো মধ্যে কোনও পার্থক্য করিনা। আমরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি।{২:১৩৬}

মহান আল্লাহ ইবরাহিম আ.-এর মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন:

আল্লাহ বিশ্ববাসীর মধ্যে বাছাই করেছেন আদম, নুহ, ইবরাহিমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে। {৩:৩৩}

যখন ইবরাহিমকে তার প্রভু কয়েকটি কথার মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন এবং সে তা পরিপূর্ণ করেছিল (উত্তীর্ণ হয়েছিল)তখন তার প্রভু তাকে বলেছিলেন- আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা বানিয়েছি। সে বললো- আমার সন্তানরা? প্রভু বললেন- আমার প্রতিশ্রুতি যালিমদের জন্য নয়। {২:১২৪}

শুধু যে নিজেকে বোকা বানিয়েছে সে ছাড়া মিল্লাতে ইবরাহিম (ইবরাহিমের আদর্শ ও জীবনপদ্ধতি) থেকে কে মুখ ফিরায়? নিশ্চয়ই দুনিয়াতে আমরা তাকে বাছাই করেছি- আর আখিরাতেও সে ন্যায়পরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত। যখন তার প্রভু বললেন- অনুগত হও (আসলিম); সে বলল- জগৎসমূহের প্রতিপালকের প্রতি অনুগত হলাম। {২:১৩০,১৩১}

এবং কে দীনের দিকে শ্রেষ্ঠ- যে আল্লাহর কাছে অবনত এবং সে সৎকাজ করে এবং অনুসরণ করে একনিষ্ঠ ইবরাহিমের মিল্লাত (মিল্লাতা ইবরহিমা হানিফা); আর আল্লাহ ইবরাহিমকে বন্ধু (খলিল) করে নিয়েছেন। {৪:১২৫}

আমরা ইবরাহিমকে তার জাতির মোকাবিলায় এসব যুক্তি-প্রমাণ দিয়েছিলাম। আমরা যাকে চাই উঁচু মর্যাদা দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু প্রজ্ঞাবান সর্বজ্ঞানী। {৬:৮৩}

এভাবেই আমরা ইবরাহিমকে মহাকাশ ও যমিনের রাজ্য/ জগৎ (মালাকুতা) দেখালাম- যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়। {৬:৭৫}

আমরা ইতোপূর্বে ইবরাহিমকে সত্য পথের জ্ঞান দিয়েছিলাম, তার বিষয়ে আমরা বিশেষভাবে অবগত। {২১:৫১}

মহান আল্লাহ ইবরাহিম আ. এর নানা ঘটনা বর্ণনা করেছেন:

আর যখন আমরা এই ঘরকে মানবজাতির প্রত্যাবর্তন-স্থল ও নিরাপদ-স্থান বানালাম এবং গ্রহণ করো ইবরাহিমের দাঁড়িয়ে অনুসরণ থেকে (ওয়াত্তাখাযু মিন্ মাক্বমি ইবরাহিমা মুসল্লা); আর আমরা ইবরাহিম ও ইসমাইলের প্রতিজ্ঞা নিলাম যে- তোমরা আমার ঘর পবিত্র রাখবে যারা তাওয়াফ করে, অবস্থান করে ও বিনীতভাবে মেনে নেয় (রুক্কাইস্‌ সুজুদ)। {২:১২৫}

বিস্তারিত আরও বর্ণণা প্রবন্ধের শেষে- পরিশিষ্ট অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাতে আছে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন- ইবরাহিমের দাঁড়ানোর স্থান (মাকামে ইবরাহিম)। যে কেউ সেখানে প্রবেশ করবে- সে নিরাপদ। আর মানবজাতির ওপর আল্লাহর- ঘরে হজের (হিজ্জুল বাইত) পথে সামর্থ্যবান; আর যে অস্বীকার করে- নিশ্চয়ই আল্লাহ জগৎসমূহের মুখাপেক্ষী নন। {৩:৯৭}

আর ইবরাহিম তার সন্তানদের এবং ইয়াকুবকে ওসিয়াত করেছিল- হে আমার সন্তানরা, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্যে বাছাই করেছেন আদ্ দীন– তাই আত্মসমর্পণকারী না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।

তোমরা কি সেখানে ছিলে- ইয়াকুব যখন মৃত্যুমুখে? যখন সে তার সন্তানদের বলেছিল- আমার পরে তোমরা কিসের ইবাদত করবে? তারা বলেছিল- আমরা ইবাদত করবো আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাঈল ও ইসহাকের ইলাহ; যিনি একক; এবং আমরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণকারী। {২:১৩২,১৩৩}

তুমি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখনি- যে ইবরাহিমের সাথে তর্ক করছিল তার প্রভুকে নিয়ে? কারণ আল্লাহ তাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দিয়েছিলেন; যখন ইবরাহিম বলেছিল- আমার প্রভু তিনি, যিনি জীবন দেন ও মৃত্যু ঘটান। সে বললো- আমিই জীবন দেই ও মরণ দেই;  ইবরাহিম বললো- আল্লাহ সূর্য ওঠান পূর্ব থেকেতুমি তাকে পশ্চিম থেকে ওঠাও; এ-কথা শুনে কাফিরটি হতভম্ব হয়ে গেলো; আল্লাহ যালিমদের সঠিক পথ দেখান না। {২:২৫৮}

তখন তার কওম তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। সে তাদের বলেছিল- তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে আমার সাথে তর্ক করছো
অথচ তিনি আমাকে হিদায়াত দান করেছেন। তোমরা তাঁর সাথে যাদের শরিক করছো আমি তাদের ভয় করি না, তবে আমার প্রভু যদি কিছু চান সেটা ভিন্ন কথা। সব কিছুর উপর আমার প্রভুর জ্ঞান পরিব্যাপ্ত। তোমরা কি বোঝার চেষ্টা করবে না?
{৬:৮০} 


আহলে কিতাব ইবরাহিম আ. সম্পর্কে যে বিতর্ক করে সে বিষয়ে মহান আল্লাহ বলছেন:

আর তারা বলে- ইহুদি হয়ে যাও, কিংবা খ্রিষ্টান হয়ে যাও, তবেই হিদায়াত লাভ করবে। বলোবরং, তোমরা সব কিছু ত্যাগ করে ইবরাহিমের আদর্শ গ্রহণ করো; আর সে মুশরিক ছিল না। {২:১৩৫}

নাকি তোমরা বলতে চাও যেইবরাহিম, ইসমাঈল, ইসহাক এবং ইয়াকুব ও তার বংশধররা ইহুদি কিংবা নাসারা ছিলো? বলোতোমরাই কি বেশি জানো, নাকি আল্লাহ? ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় যালিম আর কে হতে পারে, যার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণ আসার পরও সে তা গোপন করে? আল্লাহ মোটেও গাফিল নন তোমাদের কাজ সম্পর্কে{২:১৪০}

হে আহলে কিতাব! তোমরা ইবরাহিমকে নিয়ে কেন তর্ক করো? অথচ তাওরাত ও ইনজিল তো তার পরে নাযিল হয়েছে। তোমরা কি বিচার-বিবেচনা করবে না? {৩:৬৫}

ইবরাহিম ইহুদিও ছিলনা খ্রিষ্টানও ছিল না; বরং সে ছিলো একনিষ্ঠ মুসলিম; আর সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও ছিল না। {৩:৬৭}

মোহাম্মদ রসুলাল্লাহর প্রতি নির্দেশ:

হে নবী বলো- আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি, আমাদের কাছে যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং যা নাযিল করা হয়েছে ইবরাহিম, ইসমাঈলইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরদের কাছে- তার প্রতি; আর যা দেয়া হয়েছে মুসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীদেরকে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে তার প্রতিও। আমরা তাদের কারো মধ্যে কোনো প্রকার পার্থক্য করি না। আমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী। {৩:৮৪}

হে নবী! বলো- আল্লাহ সত্য বলেছেন, সুতরাং তোমরা একনিষ্ঠ ইবরাহিমের মিল্লাত অনুসরণ করো; আর সে মুশরিক ছিল না। {৩:৯৫}

হে নবী! বলো- আমার প্রভু আমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। সেটাই প্রতিষ্ঠিত দীন- ইবরাহিমের মিল্লাত (আদর্শ); ইবরাহিম ছিলো একনিষ্ঠ; সে মুশরিক ছিল না। {৬:১৬১}

ইবরাহিম আ. কী করেতেন? তিনি প্রশ্ন করতেন। তিনি অনুসন্ধান করতেন; যুক্তি দিয়ে কথা বলতেন:

আর স্মরণ করো, ইবরাহিম যখন বলেছিল- আমার প্রভু! তুমি কীভাবে মৃতকে জীবিত করো, তা আমাকে দেখাও।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি বিশ্বাস করোনা? সে বললো:- হ্যাঁ; কিন্তু আমার কলবে প্রশান্তি চাই…। {২:২৬০}

ইবরাহিম বললো:‘‘তোমরা দোয়া করলে তারা কি তোমাদের দোয়া শোনে? {২৬:৭২}

ইবরাহিম বললো- তোমরা কিসের ইবাদত করছো- তা কি ভেবে দেখো না? {২৬:৭৫}

সে তার পিতাকে বলেছিল- বাবা! আপনি কেন এমন জিনিসের ইবাদত করেন যা দেখেনা, শোনেনা এবং আপনার কোনো উপকার করেনা? {১৯:৪২}

যখন সে তার বাপ ও কওমকে বলেছিল- তোমরা কোন্ জিনিসের ইবাদত করছো? {২৬:৭০}

সে বললো- তোমরা ডাকলে তারা শোনে? অথবা তারা কি তোমাদের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে? {২৬:৭২,৭৩}

সে বললো- তোমরা কিসের ইবাদত করছো- তা কি দেখো না? {২৬:৭৫}

তারপর যখন তার উপর ছেয়ে এলো রাতের আঁধার, সে একটি নক্ষত্র দেখে বললো- এই আমার রব! কিন্তু তা অস্ত গেলো; সে বললো- অস্ত যাওয়াদের আমি পছন্দ করিনা।

পরে সে দেখলো উজ্জ্বল চাঁদ উঠেছে; সে বললো- এই আমার রব! অতপর চাঁদও যখন অস্ত গেলো; সে বললো- আমার রবই যদি আমাকে সঠিক পথ না দেখান, তাহলে অবশ্যই আমি বিপথগামী মানুষের দলে পড়ব!

অতপর যখন সে দীপ্ত সূর্য উঠতে দেখলো; বললো- এটাই হবে আমার রব! এতো সবার বড়। কিন্তু যখন সেটিও অস্ত গেলো, এবার সে (ইবরাহিম) বললো- হে আমার কওম! তোমরা যাদেরকে শরিক করো আমি তাদের থেকে মুক্ত। {৬:৭৬-৭৮}

ইবরাহিম আ. যা বলতেন:

আমি নিষ্ঠার সাথে আমার মুখ ফিরালাম সেই মহান সত্তার জন্যে যিনি সৃষ্টি করেছেন মহাকাশ ও যমিন। আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত না। 
তখন তার কওম তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। সে তাদের বলেছিল- তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে আমার সাথে তর্ক করছো?
অথচ তিনি আমাকে হেদায়েত দান করেছেন। তোমরা তাঁর সাথে যাদের শরিক করছো আমি তাদের ভয় করিনা, তবে আমার প্রভুই যদি কিছু চান সেটা ভিন্ন কথা। সব কিছুর উপর আমার প্রভুর জ্ঞান পরিব্যপ্ত। তোমরা কি বোঝার চেষ্টা করবে না?
যারা ঈমান আনে এবং ঈমানকে যুলুম (শিরক) মিশ্রিত করে কলুষিত করেনা, তাদের জন্যেই রয়েছে নিরাপত্তা, আর তারাই হেদায়েত প্রাপ্ত। {৬:৭৯-৮২}

ইবরাহিম বলেছিল- তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে মূর্তির উপাসনা করো- দুনিয়ার জীবনে তোমাদের পারস্পারিক বন্ধুত্বের খাতিরে। কিন্তু কিয়ামতের দিন এই তোমরাই পরস্পরকে অস্বীকার করবে এবং পরস্পরকে লানত দেবে। তোমাদের আবাস হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোনো সাহায্যকারী হবেনা।{২৯:২৫}

বাবা! শয়তানের ইবাদত করবেন না। শয়তান তো রহমানের চরম অবাধ্য।
বাবা! আমি আশংকা করছি, আপনাকে রহমানের আযাব স্পর্শ করবে, তাতে আপনি শয়তানের বন্ধু হয়ে পড়বেন। {১৯:৪৪,৪৫}

আমি আপনাদের থেকে এবং আপনারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাকেন- তাদের থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। আমি শুধু আমার প্রভুকেই ডাকবো। আমি আশা করি- আমার প্রভুকে ডেকে আমি ব্যর্থ হব না। {১৯:৪৮}

তারা সবাই আমার দুশমনরাব্বুল আলামিন ছাড়া।

কারণ, তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তিনি আমাকে খাওয়ানপান করান। আমি রোগগ্রস্ত হলে তিনিই আমাকে নিরাময় করে দেন। তিনিই আমার মউত ঘটাবেন এবং পুনরায় হায়াত দেবেন। তাঁর ব্যাপারে আমি আশা করি, তিনি আমাকে আমার গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন প্রতিদান দিবসে। আমার
প্রভু! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং মিলিত করুন সালেহ্ লোকদের সঙ্গে। পরবর্তী লোকদের মধ্যে আমার সুখ্যাতি দান করুন। আমাকে জান্নাতুন নায়ীমের ওয়ারিশদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

আমার বাবাকে ক্ষমা করে দিনকারণ তিনি গোমরাহদের একজন। পুনরুত্থান দিবসে আপনি আমাকে অপমানিত করবেন না; যেদিন মাল সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না, তবে উপকার লাভ করবে সে, যে হাজির হবে শুদ্ধ-শান্ত কলব নিয়ে।

সেদিন মুত্তাকিদের কাছেই নিয়ে আসা হবে জান্নাত। আর বিভ্রান্তদের জন্যে খুলে দেয়া হবে জাহান্নাম। {২৬:৭৮-৯১}

তিনি তোমাদের জন্যে স্থির করে দিয়েছেন সেই একই দীন, যা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন নুহকে এবং যা এখন আমরা ওহি করছি (হে মুহাম্মদ!) তোমাকে। এটাই সেই দীন যা আমরা স্থির করে দিয়েছিলাম ইবরাহিম এবং মুসা ও ঈসাকে। এই দীন প্রতিষ্ঠা করো এবং তাতে কোনো বিভক্তি সৃষ্টি করো না। মুশরিকদের জন্যে বড়ই অসহনীয়- যার দিকে তুমি ডাকছো। আল্লাহ নিজের জন্যে বাছাই করেন- যাকে তিনি চান এবং তাঁর দিকে পথ দেখান- যে ফিরে আসে (ইয়ুনিব)। {৪২:১৩}

আর তখন ইবরাহিম তার পিতা ও তার জাতিকে বলেছিল- নিশ্চয়ই আমি সম্পর্কচ্ছেদ করলাম আপনারা যার ইবাদত করেন। {৪৩:২৬}

ইবরাহিম আ. এবং তাঁর সাহাবিদের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদুর রসুলাল্লাহ এবং আমাদের জন্য উত্তম উদাহরণ বা উসউয়াতুন হাসানা

তোমাদের জন্যে রয়েছে একটি উত্তম উদাহরণ/ আদর্শ ইবরাহিম ও তার সাথীদের মধ্যে। তারা তাদের কওমকে বলেছিল- তোমাদের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করো তাদের সাথেও। আমরা তোমাদের অমান্য করছি। তোমাদের ও আমাদের মাঝে শুরু হলো চিরন্তন শত্রুতা ও বিদ্বেষ- যতদিন-না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।

শুধু নিজ পিতার প্রতি ইবরাহিমের এই কথাটা ছাড়া- আমি আপনার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবো, তবে আপনার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে কোনো কিছু করার অধিকার রাখি না।

আমাদের প্রভু! আমরা আপনার প্রতি তাওয়াক্কুল করলাম, আমরা আপনারই অভিমুখী হলাম এবং প্রত্যাবর্তন তো হবে আপনারই কাছে। {৬০:৪}

সারকথা:

এসব আয়াতের বাইরেও মহাগ্রন্থে হযরত ইবরাহিম-কে নিয়ে নানা বক্তব্য আছে। উপরের আলোচনায় আল্লাহর রসুল ইবরাহিমের মিল্লাত বা তাঁর দীনের নানা বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।

তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল- তিনি বাপ-দাদার কাছে পাওয়া ধর্ম-মত-পথের অনুসরণ করতেন না। প্রচলিত সব প্রার্থনা-পদ্ধতি, অন্ধ-আনুগত্য ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।

তিনি একাই গোটা সমাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধুমাত্র- একনিষ্ঠভাবে মহান রব্বুল আলামিনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তিনি একাই ছিলেন গোটা উম্মত বা গোটা জাতির মতো মর্যাদাবান!

তিনি সব কিছুতেই প্রশ্ন করতেন। কোনও কিছুই তাঁর কৌতূহলের বাইরে থাকে নি।

তিনি যুক্তি-বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলতেন এবং সবার চক্ষু উন্মোচন করার চেষ্টা করতেন।

তিনি চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র বিশ্লেষণ ও চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে মহান রব/ স্রষ্টা/ প্রতিপালকের অনুসন্ধান করেছেন, তাঁকে খুঁজে পেয়েছেন এবং তাঁকে রব হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

তিনি তাঁর বংশধরদের সঠিক ব্যবস্থার (দীনের) ওপর প্রতিষ্ঠিত রেখে গেছেন- গোটা এক উম্মত বা জাতি তৈরি করে দিয়ে গেছেন।

এটাই হলো ইসলাম। স্বচ্ছ, শুদ্ধ, আনুষ্ঠানিক আচারমুক্ত, যুক্তি-বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সর্বাধুনিক মানের জীবনব্যবস্থা।

যেই দীনের অনুসরণ ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার মহান মিশন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন তাঁরই বংশধর প্রিয়নবী মোহাম্মদ রসুলাল্লাহ।

পরিশিষ্ট:

#ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আরও কিছু ঘটনা

যখন ইবরাহিম বলেছিল- আমার প্রভু! এই মক্কা নগরকে নিরাপদ নগর বানিয়ে দিন এবং এর অধিবাসীদের যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনবে, ফল-ফলারি দিয়ে তাদের জীবন ধারণের উপকরণ সরবরাহ করুন।

তিনি বললেন- আর যে কুফুরি করবে তাকেও অল্প কিছুকাল জীবন সামগ্রী দেবো, তারপর আমি তাকে বাধ্য করবো আগুনের আযাব ভোগ করতে, আর খুবই নিকৃষ্ট গন্তব্য সেটা।

আর স্মরণ করো, ইবরাহিম ও ইসমাঈল যখন এই ঘরের ভিত উঠাচ্ছিল, তখন তারা বলেছিল- আমাদের প্রভু! আমাদের পক্ষ থেকে আমাদের এ কাজ কবুল করুন; নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞানী ।

আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকেই আপনার প্রতি আত্মসমর্পণকারী বানান, আর আমাদের বংশধরদের থেকেও আপনার প্রতি একটি মুসলিম উম্মাহ (অনুগত জাতি) বানান। আমাদেরকে ইবাদত শিখিয়ে দিন এবং আমাদের অনুশোচনা গ্রহণ করে আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি অনুশোচনা গ্রহণকারী অতীব ক্ষমাশীল, দয়াময়।

আমাদের প্রভু! এদের কাছে তাদের মধ্য থেকেই একজন রসুল পাঠিয়ে দিন, যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে (তোমার) কিতাব এবং হিকমা শিক্ষা দেবেন আর তাদেরকে তাযকিয়া করবেন। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশক্তিমান সর্বজ্ঞানী।’’ 

শুধু যে নিজেকে বোকা বানিয়েছে সে ছাড়া মিল্লাতে ইবরাহিম (ইবরাহিমের আদর্শ ও জীবনপদ্ধতি) থেকে কে মুখ ফিরায়? নিশ্চয়ই দুনিয়াতে আমরা তাকে বাছাই করেছি- আর আখিরাতেও সে ন্যায়পরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত। যখন তার প্রভু বললেন- অনুগত হও (আসলিম); সে বলল- জগৎসমূহের প্রতিপালকের প্রতি অনুগত হলাম।

আর ইবরাহিম তার সন্তানদের এবং ইয়াকুবকে ওসিয়াত করেছিল- হে আমার সন্তানরা, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্যে বাছাই করেছেন আদ্ দীন– তাই আত্মসমর্পণকারী না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। {২:১২৬-১৩২}

ইবরাহিম যখন বলেছিল- আমার প্রভু! আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে দেখান।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি বিশ্বাস করোনা? সে বললো- হ্যাঁ; কিন্তু আমার কলবে প্রশান্তি চাই। তিনি বললেনচারটি পাখি নাও, পোষ মানাও। তারপর তাদের অংশ প্রত্যেক পাহাড়ের চুড়ায় রাখো; তারপর ডাকো; তারা তোমার দিকে দ্রুত আসবে। আর জেনে রাখো, অবশ্যই আল্লাহ সর্বশক্তিমান- হুকুমদাতা (আঝিজুন হাকিম)। {২:২৬০}

সে তার পিতাকে বলেছিল- বাবা! আপনি কেন এমন জিনিসের ইবাদত করেন যা দেখেনা, শোনেনা এবং আপনার কোনো উপকার করেনা?
বাবা! আমার কাছে প্রকৃত জ্ঞান এসেছে, যা আপনার কাছে আসেনি। সুতরাং আপনি আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাবো।
বাবা! শয়তানের ইবাদত করবেন না। শয়তান তো রহমানের চরম অবাধ্য।
বাবা! আমি আশংকা করছি, আপনাকে রহমানের আযাব স্পর্শ করবে, তাতে আপনি শয়তানের অলি হয়ে পড়বেন।

সে বললো- ইবরাহিম! তুমি কি আমার ইলাহ্দের থেকে বিমুখ? তুমি যদি বিরত না হওতাহলে আমি পাথর মেরে তোমাকে হত্যা করবো। তুমি চিরদিনের জন্যে আমাকে ত্যাগ করে চলে যাও।

ইবরাহিম বললো- আপনার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রভুর কাছে আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো, নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহশীল।

আমি আপনাদের থেকে এবং আপনারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাকেন তাদের থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। আমি শুধু আমার প্রভুকেই ডাকবো। আমি আশা করি আমার প্রভুকে ডেকে আমি ব্যর্থ হব না। {১৯:৪২-৪৮}

প্রথম প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২২

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *